অপরাধী কিশোর গ্যাং!

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৫১ এএম

কিশোর গ্যাং এখন মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। বর্তমানে এই গ্যাং শহর থেকে গ্রাম, পাড়া-মহল্লায়, অলিগলিতে গড়ে উঠছে। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনীতিবিদদের প্রশ্রয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার কারণে এসব গ্যাং ভয়ংকর হচ্ছে। ইউনিসেফের হিসাবে, বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা ৩ কোটি ৬০ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। ২০১৮ সালের ৬ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরায় ‘ডিসকো বয়েজ’ ও ‘নাইন স্টার’ নামে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে খুন হয় নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির। মূলত এরপরই কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই বর্তমানে সক্রিয় ৪৯টি ‘কিশোর গ্যাং’ গ্রুপ এবং তাদের সদস্য রয়েছে প্রায় ৯০০! আবার ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িতদের ৪০ শতাংশ কিশোর। দেশে দুইশর বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে, যাতে পাঁচ হাজারের বেশি সদস্য! এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, সার্বিক আইনশৃঙ্খলার চিত্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালান, অপহরণ, যৌন হয়রানি, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি থেকে শুরু করে গুম-খুনের মতো অপরাধে কিশোররা জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নেপথ্যে তাদের শক্তি জোগাচ্ছে যারা, সেই গডফাদারদের আইনের মুখোমুখি করবে কে?

যে সময় পরিবার ও সমাজের নিবিড় যতেœ কিশোরদের বেড়ে ওঠার কথা, সে সময় পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক অনুশাসনকে অবজ্ঞা করে কিশোররা যুক্ত হচ্ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এ পর্যন্ত শুধু ঢাকায়ই কিশোর অপরাধীদের হাতে ১২৫ জন খুন হয়েছে এবং এর মধ্যে গত দুই বছরেই ৩৬ জন খুন হয়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে রবিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। নামে ‘কিশোর গ্যাং’ হলেও এসব অপরাধী চক্রের বেশিরভাগ সদস্য এখন আর কিশোর নয়। এখন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, ধর্ষণ, মাদক কারবার, জমি দখলে সহায়তা এবং যৌন হয়রানির মতো ভয়ংকর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে তারা। দেশে বর্তমানে দুইশর বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। যাতে পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্য। নামে ‘কিশোর গ্যাং’ হলেও এসব অপরাধী চক্রের বেশিরভাগ সদস্যের গড় বয়স ১৮ বছরের বেশি। অবশ্য এসব গ্রুপে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীরাও রয়েছে। এসব কিশোর গ্যাংয়ের প্রত্যেক সদস্যের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য। দলের বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং স্কুল বা কলেজপড়–য়া। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং লেখাপড়া না জানা কিশোর-তরুণও রয়েছে এসব দলে। পুলিশ বলছে, ‘কিশোর গ্যাং’ নাম দিয়ে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। ‘কিশোর গ্যাং’ বললে গ্রেপ্তারের পর আদালতেও এসব অপরাধী চক্রের সদস্যরা ‘কিশোর’ হিসেবে পরিচয় পায়। তখন তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন মাদকাসক্তি, দারিদ্র্য, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, পরিবারিক সমস্যা, হতাশা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব এবং ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবেই মূলত কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে। নগরায়ণের প্রভাবে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে একক পরিবারে পরিণত হচ্ছে। ফলে কিশোররা পারিবারিক অনুশাসনে দীক্ষিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তা ছাড়া কেউ কেউ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের লক্ষ্যে এবং এলাকায় আধিপত্য বজায় রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করছে নানা সন্ত্রাসীমূলক কর্মকাণ্ডে। কিশোর গ্যাং ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সামাজিক অবক্ষয় ভয়াবহরূপে দেখা দিতে পারে। কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের সুষ্ঠু সংস্কার অতীব জরুরি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম কেউ অপরাধ করলে তাকে ‘কিশোর অপরাধী’ হিসেবে গণ্য করা হয়। হত্যাকাণ্ডের মতো সর্বোচ্চ অপরাধের জন্য শাস্তি মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড। কিশোর অপরাধের মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শাস্তির মাত্রা লঘু হওয়ায় কিশোররা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। ফলে অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে আইন সংস্কার প্রয়োজন। প্রয়োজনে কিশোর কারাগার ব্যবস্থা চালু এবং কিশোর সংশোধন কেন্দ্রগুলোকে সময়োপযোগী করে সংশোধন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। কিশোর গ্যাং নির্মূল করতে হলে, এর নেপথ্যে যারা আছে তাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে। দিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত