সরকার যার পুলিশ তার

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৪১ এএম

প্রাচীনকাল থেকেই ‘পুলিশ’ শব্দটির সঙ্গে মানুষের অনেক ধরনের আবেগ-অভিজ্ঞতা জড়িয়ে রয়েছে। তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের রাগ-ক্ষোভ দুঃখ-ঘৃণা যেমন আছে তেমনি গর্ব, ভালোবাসা এবং সম্মানও আছে। ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’ এই প্রবাদটির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনাই বর্তমানে কঠিন বিষয়। এর জন্য প্রচলিত পুলিশিং ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার এবং সব ধরনের দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত জনকল্যাণমুখী একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের দরকার হলেও, তা এ সময় কতটুকু সম্ভব? আদৌ কি স্বাধীনভাবে সেবা প্রদান, দলীয় রাজনীতির খবরদারি এবং ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার না করে এই বাহিনীকে এগিয়ে নেওয়া যাবে? বাস্তবতা কী বলে? 

ব্রিটিশ সময় বা পাকিস্তান আমলের কথা বাদ থাক। স্বাধীন বাংলাদেশেই বা পুলিশের পথচলা কতটুকু মসৃণ ছিল? কোন রাজনৈতিক সরকারের সময় তারা মুক্ত-স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে? দেখা গেছে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সরকার নিজেদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই বাহিনীকে নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে। তাও আবার তাদের বিরুদ্ধে, যাদের করের টাকায় তাদের চলতে হচ্ছে। হয়তো ইচ্ছা না থাকলেও, অনেক পুলিশ সদস্য বাধ্য হয়েই সরকারের নির্দেশমতো জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এককভাবে কোনো পুলিশের দায় নয় এটি। তবু এর দায় নিতে হয় পুরো পুলিশ বাহিনীকেই। আবার এর উল্টো পিঠে রয়েছে আরেক চিত্র।

কথায় আছে ‘বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।’ কথাটি এমনি এমনি আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে আমরা শুনে আসছি, পুলিশি বাণিজ্যের কথা। সাধারণ মানুষ কীভাবে তাদের কাছে বন্দি, ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। জনগণের প্রতি এই বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যের দায়বদ্ধতা একেবারেই যে নেই তা বলা যাবে না, তবে তার সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন করার অভিযোগে সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার পরিণতি কী হয়েছে, আমরা জানি না।  বিশ্লেষকরা বলছেন, সিংহভাগ পুলিশ কর্মকর্তাই কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতি করেছে। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশের অপরাধ বন্ধ হয়নি। এই অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের নৈতিকতার উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব? এটা তো কোনো সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব হবে না। মনে রাখতে হবে, শিক্ষা-সভ্যতা-নৈতিকতা কোনো সংস্কারের মাধ্যমে আসে না। এটা দীর্ঘ সময়ের চর্চার ফসল। সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে পথচলার ক্ষেত্রে দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ একটি বড় বিষয়। কিন্তু এই বিষয়টির প্রতি আমাদের তেমন কোনো সচেতনতা নেই।

বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করতে হলে অবশ্যই ১৮৬১ সালের সেই ঔপনিবেশিক আমলের পুলিশ অ্যাক্ট থেকে সরে আসতে হবে। যে আইনে সেবার চেয়ে নিয়ন্ত্রণেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০৭ এবং ২০১৩ সালে, পুলিশ সংস্কার প্রকল্পের অধীনে নতুন একটি পুলিশ অধ্যাদেশের খসড়া তৈরিতে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। যার কাজ চলমান ছিল ২০০৬ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত। এই খসড়া অধ্যাদেশে গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব পুলিশিংয়ের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থাসহ জনসাধারণের পক্ষ থেকে তদারকি এবং জবাবদিহি আদায়ের বিধান রাখা হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও খসড়া অধ্যাদেশ এবং ২০১৩ সালের পর্যালোচনা রাজনৈতিক পর্যায়ে সিদ্ধান্তের অভাবে থমকে যায়। কেন এটি থমকে গেল, কেনইবা কোনো গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না, তা আমাদের জানা নেই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও সশস্ত্র সংগ্রামে অংশ নেওয়ার মতো গৌরবময় ইতিহাসের প্রথম অধ্যায় ছিল, পুলিশি প্রতিরোধ। স্বাধীনতা-উত্তর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে এ বাহিনী তাদের কর্তব্য পালন করে আসছে। পুলিশকে যখন আমরা উন্নত কোনো দেশের উপযোগী করে গড়ে তোলার কথা বলি তখন অবশ্যই সে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক মর্যাদা, মূল্যবোধ, অর্থনীতি ও আইনের শাসনসহ অনেক কিছুই বিবেচনায় নিয়ে কথা বলা দরকার। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর বাংলাদেশ পুলিশ অন্যান্য দেশের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে তাদের দায়িত্ব পালন শুরু করে। দেশে জঙ্গিবাদ দমন ও নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতেও সুনাম কুড়িয়েছে। দেশে পুলিশিংয়ের জন্য পর্যাপ্ত এবং ন্যায়সঙ্গত সম্পদ বরাদ্দ প্রয়োজন। দেশের আইনশৃঙ্খলাজনিত মূল জাতীয় সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ অবশ্যই নেওয়া দরকার। তবে তা রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রণ করলে হয়তো আরও ভালো হতে পারে। কারণ তাদের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে জনগণ। পরবর্তী সময় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বর্তমান সংস্কারকে কতটুকু গুরুত্ব দেবে বা আদৌ দেবে কি না তা প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পুলিশি সংস্কারের মূল কথা বাদ দিয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে তাদের থামাবে কে? এই বিষয়টি পরিষ্কার করা ভালো। যদি এই সংস্কার সত্যিকার অর্থে বাস্তবতার আলো পেতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই তা সম্ভব। না হলে কোনোভাবেই তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। দেখা যাবে, এর ফলে অর্থ এবং সময়ের অপচয়ই তখন মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আর পেছনে পড়ে থাকবে পুলিশি সংস্কার।

আসলে পুলিশকর্মীদের প্রশিক্ষিত ও প্রভাবিত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশিং সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগকে আরও জোরদার করতে হবে। পুলিশকে উন্নত দেশের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে তাদের দক্ষতা, সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ যা যা প্রয়োজন তা প্রদান করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়ানো ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আন্তঃবাহিনী কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা জরুরি। আর এটা স্বল্পমেয়াদি বা কোনো নীতি কৌশলের মাধ্যমে হঠাৎ করে সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, এই কাজ করতে হবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরই। কারণ তাদেরই পুলিশ সংস্কারের চূড়ান্ত দায়িত্ব পালন করতে হবে। সুতরাং প্রায়োগিক দিকটি তাদেরই দেখতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগ অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার মতো। তবে এর সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততা এবং আন্তরিক প্রতিশ্রুতি না থাকলে, সংস্কারে কোনো লাভ হবে না। কারণ আমাদের বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে সরকার যার, পুলিশ তার। সেই দলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই পুলিশের আইন। দলীয় রাজনৈতিক সরকারের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে পুলিশকে কোন দল, কবে কাজ করতে দিয়েছে আমাদের তা স্মরণে আসে না। এ রকম বাস্তবতার মধ্যে, পুলিশি সংস্কার কতটুকু আলোর মুখ দেখবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। পাশাপাশি আরেকটি কথা বলা প্রয়োজন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বর্তমান সংস্কার কতটুকু সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 

লেখক: টেক্সটাইল ব্যবসায়ী ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত