সচিবালয়ে আগুন

মানা হয়নি সতর্কতা সুপারিশ

  • ৪ বছর আগে চিহ্নিত সমস্যার সমাধানে ছিল না পদক্ষেপ
  • ফায়ার সার্ভিসের অনুকূল ছিল না পরিস্থিতি
  • এক দিন পরও আগুনের সূত্রপাতের কারণ জানা যায়নি
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১১:০২ পিএম

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের সবচেয়ে বড় ৭ নম্বর ভবনে লাগা আগুন অল্প সময়ে ভয়াবহ আকার নেয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের ২১১ জন কর্মী প্রায় ১০ ঘণ্টার চেষ্টায় নেভান গত বুধবার মধ্যরাতে লাগা সেই আগুন। আগুন লাগার পর দ্রুত সময়ে ভয়াবহ আকার নেওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন সেদিন অগ্নিনির্বাপণে কাজ করা ফায়ার ফাইটাররা।

সচিবালয়ের ফটকগুলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো উপযুক্ত বা বড় নয়। পুরনো ভবন সংস্কার করে সাজসজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে কাঠের মতো আগুন সুপরিবাহী বস্তু। এ ছাড়া ভেতরে পর্যাপ্ত ফায়ার হাইড্রেন্ট না থাকায় আগুন নেভাতে রাস্তার ওপারে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের রিজার্ভার থেকে পাইপের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করতে হয়। আর এতে করে পানির গতি কম হওয়ায় দ্রুত বাড়তে থাকা আগুনের উত্তাপ কমাতে বেগ পেতে হয় ফায়ার ফাইটারদের।

তাদের এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সচিবালয়ের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক নানা দিক নিয়ে খোঁজ করা হয়। তাতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। ফায়ার ফাইটারদের তোলা এসব অভিযোগ সম্পর্কে চার বছর আগেই সতর্ক ও সুপারিশ করা হয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে।

২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার সচেতনতার জন্য সচিবালয়ের ৪ নম্বর ভবনে ‘অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার মহড়া’ চালায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। তবে সচিবালয়ের প্রবেশ ফটক ছোট হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়িগুলো সেদিন ভেতরে ঢুকতে পারেনি।

ওইদিন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা বিভাগের তৎকালীন সহকারী পরিচালক ছালেহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সচিবালয়ে কোনো অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে তা মোকাবিলা করা কঠিন হবে। কারণ, সচিবালয়ের প্রবেশ গেটগুলো খুবই ছোট। এসব গেট দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে নেওয়া যায় না। ফলে যেসব গাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশই সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারেনি। মহড়ার জন্য যেসব বড় গাড়ি আনা হয়েছিল, সেগুলো সচিবালয়ের বাইরেই রাখতে হয়েছে। সচিবালয়ের ভেতরে যেখানে ৪০০ গাড়ি পার্কিং রাখার জায়গা রয়েছে, সেখানে ১ হাজার ২০০ গাড়ি পার্ক করা হয়। তাই যদি পিক আওয়ারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে ফায়ার সার্ভিসের কোনো গাড়ি সঠিকভাবে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেয় ফায়ার সার্ভিস। সচিবালয়ের ভেতরের সংযোগ সেতুগুলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের প্রতিবন্ধক বলেও একাধিকবার জানিয়েছিলেন কর্মকর্তারা। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা মুখ খোলেনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সব ভবনে সার্ভে করে যে দুর্বলতা আছে, তা চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যাগুলো এখনো রয়ে গেছে। এজন্য ৭ নম্বর ভবনে লাগা আগুন নেভাতে গিয়ে পদে পদে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। ৪ নম্বর ফটক দিয়ে ঢুকতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ভেঙে গেছে। গাড়ি বের করতে গিয়ে দেয়ালের কয়েক জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

সচিবালয়ে আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটির সদস্য হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে সচিবালয় এলাকায়। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেনা, পুলিশ ও এবিপিএনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যেকটি প্রবেশ দরজায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সে সময় ৭ নম্বর ভবন পরিদর্শন করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গঠিত আট সদস্যের তদন্ত কমিটি। পরিদর্শন শেষে এই কমিটির সদস্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালের কাছে অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে চান সাংবাদিকরা।

জবাবে তিনি বলেন, ‘নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা এ বিষয়ে মন্তব্য করার মতো অবস্থা এখনো হয়নি। আমরা এসেছি, বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছি। তদন্ত সাপেক্ষে বাকি কথা বলা যাবে।’

সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শুক্রবার ফাঁকা ছিল সচিবালয়। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট নানা কারণে শুধু মূল ফটক ছিল খোলা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

তিনি বলেন, ‘সচিবালয়ে কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। মূল প্রবেশপথের বাইরে গাড়ি রেখে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সকালে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আট সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্যরাও প্রবেশ করেন।’

শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়। সচিবালয়ে আগুন লাগার কারণ উদঘাটনে কর্মপন্থা নির্ধারণ করার জন্যই এ বৈঠক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সভা শেষে তদন্ত কমিটির সব সদস্য আগুনে পোড়া ৭ নম্বর ভবনের সব তলা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে কমিটির সদস্যরা আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সভায় যোগ দেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত তলাগুলোয় কী কারণে আগুন লেগেছে, তা যাচাইয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষত সিআইডি, র‍্যাব, পুলিশের এ-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল ঘুরে আলামত সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।

তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল, ফায়ার সার্ভিসের একটি দলও ছিল। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনার পর থেকেই আমাদের ক্রাইম সিন ও ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে কাজ করছে। আমরা বেশ কিছু আলামত সংগ্রহ করেছি। এ বিষয়ে মামলা হলে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে বাকি সবকিছু জানা যাবে। এর বাইরে বর্তমানে আর বেশি কিছু বলতে পারছি না।’

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১টা ৫২ মিনিটে ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। খবর পেয়ে রাত ১টা ৫৪ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রথমে আটটি ইউনিট কাজ করে। শেষ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। পরদিন সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও তা বেলা পৌনে ১২টায় পুরোপুরি নেভানো সম্ভব হয়। আগুন নেভাতে গিয়ে ট্রাকচাপায় মো. সোয়ানুর জামান নয়ন নামে একজন ফায়ার ফাইটার নিহত হন।

আগুনে ১০-তলা ভবনের প্রতিটি তলা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ছয় থেকে নয়তলা পর্যন্ত প্রায় পুরোটাই পুড়েছে। এসব তলায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; অর্থ মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিভাগ অবস্থিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত