বিমানবন্দরে বিমান ওঠানামার জন্য প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর দৃষ্টিসীমা (ভিজিবিলিটি) উপাত্ত নেওয়া হয়। ১০০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত দেখা গেলেই বিমান ওঠানামার অনুমোদন পেয়ে থাকে। কিন্তু শীত মৌসুমে সড়ক, নৌ ও রেলপথে প্রতি বছর শত শত মানুষের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও দৃষ্টিসীমা মাপার কোনো ব্যবস্থা নেই। যথারীতি ঘন কুয়াশায় মুখোমুখি সংঘর্ষ কিংবা অন্য কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা।
বিমানের পাশাপাশি সড়ক, নৌ ও রেলপথেও দৃষ্টিসীমার (ফগ ডিটেকটর মেশিন) উপাত্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানান আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। দেশের ৬২টি আবহাওয়া স্টেশনে প্রতি তিন ঘণ্টা পরপর ভিজিবিলিটি উপাত্ত পাওয়া গেলেও সড়ক, নৌ ও রেলপথে চালকদের কোনো কাজে আসে না এসব উপাত্ত। আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের পূর্বাভাসে দেশের কোন এলাকায় ঘন বা মাঝারি কুয়াশা পড়বে সেই পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো এলাকা সম্পর্কে পূর্বাভাস প্রকাশ করে না। এতেই দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোকে ঘন কুয়াশার কারণে খালি চোখে দেখা না যাওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটছে।
ভিজিবিলিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে শাহজালাল বিমানবন্দরের আবহাওয়া স্টেশনের পূর্বাভাস কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে শাহজালাল বিমানবন্দরে ভিজিবিলিটি ৪০০ মিটারে নেমে এসেছিল। তবে গতকাল সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ভিজিবিলিটি ছিল ২৫০০ মিটার।’
ভিজিবিলিটি প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যদি দৃষ্টিসীমা (খালি চোখে যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাওয়া) ১০০০ মিটার বা এর বেশি হয় তাহলে বিমান ওঠানামায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এর কম হলে আমরা বিমান ওঠানামার অনুমোদন দিই না। দেশের সবকটি বিমানবন্দরে একই অবস্থা।’
বিমানবন্দরের এই দৃষ্টিসীমার উপাত্ত রেকর্ড এবং প্রতিনিয়ত মনিটরিং করা হলেও দেশের প্রধান সড়কগুলোতে কোনো উপাত্ত নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের ৬২টি আবহাওয়া স্টেশন রয়েছে। সব স্টেশনে ভিজিবিলিটি উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। সেগুলো বিশ্লেষণ করে সারা দেশের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয় এবং কোথায় ঘন বা হালকা কুয়াশা পড়বে, সেই পূর্বাভাসে বলা হয়।’
কিন্তু সেই পূর্বাভাস তো মহাসড়কের কুয়াশার চিত্র প্রতিনিধিত্ব করে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেই পূর্বাভাসের মাধ্যমে মহাসড়কগুলোতে কুয়াশার চিত্র পাওয়া যায় না। এজন্য আমরা মহাসড়কগুলোতে অটোমেটিক সেন্টার বসাতে পারি। তাহলে সেখানে উপাত্ত রেকর্ড হবে এবং তখন অঞ্চলভিত্তিক কুয়াশার চিত্র পাওয়া যাবে। আর তা চালকদের অভিহিত করা গেলে দুর্ঘটনাও কমে আসবে।’
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘আমরা মহাসড়কগুলোতে রোড মার্কিং ও লেন মার্কিং করলেও কুয়াশার কারণে সেগুলো দেখা না গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে যদি কুয়াশার পূর্বাভাস পাওয়া যায় কিংবা কখন কোথায় কী পরিমাণ ঘনত্ব রয়েছে, তা জানা যায় তাহলে চালকরা আরও সতর্ক থাকবে। এতে দুর্ঘটনাও কমে আসবে।’
কুয়াশার পূর্বাভাস জানলে শীতের রাতে গাড়ি চালাতে আরও সহজতর হবে বলে জানান দূরপাল্লার গাড়িচালকরা। তাদের মতে, কোন সড়কে কী পরিমাণ কুয়াশা রয়েছে জানা গেলে গাড়ির গতি নির্ধারণে সহজ হয়। এ বিষয়ে কথা হয় ২০ বছর ধরে মহাসড়কে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশ ট্রাভেলসের গাড়িচালক আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গাড়ি চালানোর সময় হঠাৎ দেখি কুয়াশা বেড়ে গেছে। তাই আমরা আগে থেকে যদি জানতে পারি ওই এলাকায় কুয়াশা বেশি তাহলে গাড়ি চালাতে ঝুঁকি কম থাকে। এ ছাড়া ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টিতে কুয়াশা খুব বেশি থাকে।’
কুয়াশায় দৃষ্টিসীমার উপাত্ত জানা থাকলে দুর্ঘটনা কমে আসবে জানিয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, ‘এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা অবশ্যই কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে সড়ক ও জনপথকেও এগিয়ে আসতে হবে।’
কুয়াশায় দেখা যায় না ট্রেনের সিগন্যাল বাতি : ঘন কুয়াশার কারণে ১৫ ফুট দূরেও দেখা যায় না। এতে ট্রেন পরিচালনায়ও সমস্যায় পড়তে হয় চালকদের। আবার অনেক এলাকায় রেললাইনের ওপর দিয়ে হাঁটার সময় ট্রেন দেখতে না পেয়ে ট্রেনে কাটা পড়ছে। এ বিষয়ে সিনিয়র লোকোমাস্টার আবদুল আউয়াল রানার বলেন, ‘রেললাইনের ওপরে ঘন কুয়াশা বেশি থাকে কিন্তু রেললাইনের ডানে ও বামে কুয়াশা কম দেখা যায়। এতে আমরা অনেক সময় বিভ্রান্ত হই। কুয়াশার কারণে সিগন্যাল লাইট দেখা না যাওয়ায় সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাতের ট্রেনগুলোকে আমরা চালিয়ে নিয়ে যাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন আবহাওয়া অধিদপ্তর অনেক উন্নত হয়েছে। বিমানের মতো আমাদেরও যদি আগে থেকে পূর্বাভাস জানিয়ে দেওয়া যেত যে ওই এলাকায় এমন কুয়াশা রয়েছে, তাহলে ট্রেন পরিচালনায় আরও সহজ হতো এবং অনেক সময় মুখোমুখি ট্রেন দুর্ঘটনাও কমে আসত।’
রেললাইনে বা সড়কের মধ্যে বেশি কুয়াশা দেখা যাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, ‘খোলা জায়গায় কুয়াশা বেশি পড়ে। যেখানে গাছপালা বেশি থাকে সেসব এলাকায় কুয়াশা গাছের পাতাগুলো টেনে নেয়। কিন্তু খোলা জায়গায় কিছু থাকে না বলে কুয়াশা বেশি দেখা যায়। এজন্য নদী অববাহিকায়, ফসলের মাঠে ও রাস্তায় কিংবা রেললাইনে কুয়াশা বেশি দেখা যায়।’
আবহাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ। তিনি বলেন, ‘সড়ক ও নৌবন্দরগুলোর পাশে বিমানবন্দরের মতো ভিজিবিলিটি রেকর্ড নেওয়ার জন্য মেশিন বসানো যেতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে তা বসানো ও মনিটরিং করা হলে দেশে কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।’ এমন ডিটেকটর কোথায় কোথায় রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ^বর্তী দেশ ভারতের সড়কেও এমন মেশিন বসানো রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের অনেক দেশেই এমন ডিভাইস রয়েছে, যা দেশের কেন্দ্রীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে লিংক থাকে। আর সেই লিংক থেকেই আবহাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশার ভিজিবিলিটির পূর্বাভাস দেওয়া হয়ে থাকে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেওয়া যায় জানিয়ে সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে এখন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। আমরা বর্তমানে অনেকটা নির্ভুল পূর্বাভাস দিচ্ছি। দেশে সড়ক কিংবা নৌ-দুর্ঘটনা কমাতে সড়কের বাঁকে বাঁকে নির্ধারিত দূরত্বে ফগ ডিটেকটর মেশিন বসানো যেতে পারে। সড়ক, নৌ, দুর্যোগ ও আবহাওয়া মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে এমন কার্যক্রম নেওয়ার এখনই সময়।’
