২০২৪ সাল জুড়ে নিত্যপণ্যের বাজার ছিল অস্থিতিশীল। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সবজি, পেঁয়াজ, মাছ, মাংস ও ডিমের চড়া দাম মানুষকে চরমভাবে ভুগিয়েছিল। প্রতিদিনই মানুষ শঙ্কায় থাকছেন বাজারে গিয়ে কোনো না কোনো জিনিসের বাড়তি দাম দেখতে হবে! এমনিতেই দুই অঙ্কের ঘরে থাকা খাদ্য মূল্যস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনচাকা পিষ্ট হচ্ছিল। তার ওপর ক্ষমতার পালাবদলের ছোঁয়ায় আগস্ট থেকে চাল, আলু ও তেলের দাম নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের তেলেসমাতিতে নিম্ন আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েন।
বছর জুড়ে পণ্যের দামে টালমাটাল পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ তাদের পাত থেকে মাছ-মাংস ও পুষ্টি চাহিদার অনেক খাবারই তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর হলেও সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি। এ কারণে বছর জুড়েই পণ্যের দাম ছিলবেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত বছর যে বিষয়গুলো দেশের মানুষকে বেশি ভুগিয়েছে, তার মধ্যে সবার ওপরেই ছিল নিত্যপণ্যের উচ্চ দাম।
কাঁচা মরিচ নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড
বন্যার অজুহাতে অক্টোবর মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে কাঁচা মরিচের দামে। সংসারে প্রতিদিনকার অতি জরুরি পণ্য এই কাঁচা মরিচের কেজি খুচরা বাজারে ঠেকেছে ৬০০ টাকায়! জরুরি এই নিত্যপণ্যটির দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে ক্রেতাদের। এক কেজি বা আধা কেজি দূরের কথা, ক্রেতারা তখন কাঁচা মরিচ কিনছেন ৫০-১০০ গ্রাম করে।
সে সময় সবজি বিক্রেতারা বলেন, বন্যার পরিস্থিতির জন্য মরিচের সরবরাহ কমে যাওয়ায় হঠাৎ করে দাম বেড়ে যায়। তবে ক্রেতাদের দাবি, ইচ্ছে করেই কাঁচা মরিচের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। অবশ্য সরকারের কঠোরতা ও গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত তদারকিতে মাসখানেক পর কাঁচা মরিচের বাজারে স্বস্তি আসে।
দামের ঝাঁজে কাঁদিয়েছে পেঁয়াজ
বছরের শুরু থেকে পেঁয়াজের বাজার চড়া ছিল। তবে পরে কমে আসে। কিন্তু ৫ আগস্ট সরকারের পালাবদলের পর হু হু করে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। খুচরা ও পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের। এতে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে হিমশিম খান নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। মাঝে মসলাজাত এই পণ্যটির দাম কমলেও অক্টোবরের শেষের দিকে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ১২০ টাকায়। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাজারে শীতের আগাম পেঁয়াজ আসতে শুরু করায় দাম কমে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকায়।
ডিম কিনতে হিমশিম
অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও ডিমের বাজার ছিল অস্থিতিশীল। বিশেষ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ডিমের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তখন প্রতি ডজন ডিমের দাম ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় পৌঁছায়। বাধ্য হয়ে সরকার প্রতিটি ডিমের দাম বেঁধে দেয় ১১ টাকা করে। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো ডিমের দাম রাখেন। গত নভেম্বর মাসে ১৮ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এরপরই ডিমের বাজার স্থিতিশীল হয়।
চাহিদার থেকে ৩০ শতাংশ বেশি উৎপাদনের দেশে এখন দৈনিক ডিমের চাহিদা পাঁচ কোটি পিস। সে হিসেবে প্রতি মাসে ১৫০ কোটি পিস এবং বার্ষিক হিসেবে ১ হাজার ৮০০ কোটি পিস ডিমের চাহিদা রয়েছে। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী চাহিদার চেয়ে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি রয়েছে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে ডিমের উৎপাদন হয় ২ হাজার ৩৭৪ কোটি ৯৭ লাখ পিস। এর বিপরীতে চাহিদা রয়েছে ১ হাজার ৮০৯ কোটি ৬০ লাখ পিস। এ হিসাবে চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত থাকছে ৩০ শতাংশ। অথচ ব্যবসায়ীরা উৎপাদনের সংকট দেখিয়ে গত দুই বছর থেকেই ডিমের দাম বাড়িয়েছিল।
গরুর মাংসে হাঁসফাঁস
বছরের শুরুর দিকে গরুর মাংসের দাম ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। তখন অনেকে গরুর মাংস খাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মাংস ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে মাংসের দাম কমানোর জন্য। বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা এপ্রিল মাসে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৬৫০ টাকা বিক্রির ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। উল্টো সিন্ডিকেট করে চড়া দামে ৮০০ টাকায় মাংস বিক্রি হচ্ছে।
আলুর দামে দম বন্ধ
বিশ্বে আলু উৎপাদন বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে ১ কোটি ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৮৫ টন আলু উৎপাদন হয়, যা চাহিদা পূরণ করে রপ্তানি করা সম্ভব। কিন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের জন্য মৌসুমের শুরুতে ২০-২৫ টাকায় কেনা আলু কয়েক মাস না ঘুরতেই দাম ওঠে ৫০ টাকায়। বছর শেষে সেই আলুই বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। সরকার আলুর দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা কার্যকর হয়নি। সরকারের সব চেষ্টাই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। ভোক্তাদেরও চড়া দামে কিনতে হয় আলু।
তেলের বাজারের তেলেসমাতি
পর্যায়ক্রমেই বেড়েছে ভোজ্য তেলের দাম। দাম বাড়ানোর আগে বাজার থেকে ভোজ্য তেলের উধাও ঘটনা ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ের মতো চলছে। তা ছাড়া কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই তেলের দাম বাড়াচ্ছে কোম্পানিগুলো। বছর শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে আমদানি শুল্ক সুবিধাও নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এরপরই শুরু হয় তেল নিয়ে তেলেসমাতি। খোলা তেল ও বোতলজাত সয়াবিন সংকটকালে নভেম্বর মাসের শুরুন দিকে লিটারপ্রতি ৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণায় এক ঘণ্টাতেই তেলে সয়লাব হয় বাজার। দাম বেড়ে প্রতি লিটার ভোজ্য তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা আর খোলা তেল ১৫৭ টাকায়।
মাছের কাঁটায় চরম খোঁচা
বছরের শুরু থেকেই মাছের দামও ছিল আকাশছোঁয়া। ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষ পাত থেকে মাছ ছেঁটে ফেলেছিলেন। বাধ্য হয়ে অনেকে চড়া দামে মাছের কাঁটা ও নাড়িভুঁড়ি কিনে খেয়েছেন জানুয়ারির দিকে। সেই মাছের দাম আর নাগালের মধ্যে আসেনি। পাঙাশও বিক্রি হয়েছিল ২৫০ এবং তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৭০ টাকায়। মাঝে কিছুটা দাম কমলেও এখনো মাছের বাজারের চড়া ভাব যায়নি।
সবজির মেলায় ভাটা
কথায় আছে, শখের তোলা আশি টাকা। বছর জুড়ে সবজির বাজারের চিত্রও অনেকটা তাই। মুলা ও পেঁপে ছাড়া কেজিপ্রতি ৮০-১০০ টাকার নিচে ভালোমানের কোনো সবজিই পাওয়া যায়নি। তবে ডিসেম্বর মাসে এসে সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। শীতকালীন সবজি বাজারে আসার পর বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীরা দাম কিছুটা কমিয়েছেন।
হবিগঞ্জে গ্যাস লাইনে কাজের সময় বিস্ফোরণ, নিহত ৪
‘সীমান্তে প্রতিপক্ষের কাছে কোনো অবস্থাতেই পিঠ প্রদর্শন করবে না’
রাজধানীতে হাই-অ্যালার্ট ফায়ার সার্ভিস, কঠোর নিরাপত্তায় পুলিশ
থার্টি-ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি, ফানুস বন্ধে সন্ধ্যায় নামবে মোবাইল কোর্ট