ঘটনাবহুল ২৪ পেরিয়ে চ্যালেঞ্জ সম্ভাবনার ২৫

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৫, ০৮:৩৫ এএম

সংঘাত, নির্বাচন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, আন্দোলন-বিক্ষোভ, স্বৈশাসনের পতন, নতুন সরকার গঠনসহ নানা বিষয়ে আলোচিত ছিল ঘটনাবহুল বছর ২০২৪। একের পর এক চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী হয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। উঠেছে নতুন বছরের সূর্য। নতুন বছরের আগমনী গান ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। স্বাগত ২০২৫।

ব্যক্তি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চড়াই-উতরাই আর নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়া ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন হয়েছে। তবে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারপ্রধানের আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়ার নজির এটাই প্রথম।

আগের বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সাল শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক টানাপড়েন ও অনিশ্চয়তাকে সামনে রেখে। সেই টানাপড়েনের মধ্যেই ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবার জয়লাভ করে। এতে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে।

তিনটি জাতীয় নির্বাচন ‘জঘন্য কারচুপি ও জবরদস্তির’ মাধ্যমে প্রহসনে পরিণত করে শেখ হাসিনা একটানা ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল আরও জালিয়াতিপূর্ণ; যা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। ২০২৪ সালে এসে হয় ‘ডামি নির্বাচন’।

নির্বাচনের পরপর নতুন রূপে ভারতবিরোধী রাজনীতি দানা বাঁধতে থাকে বাংলাদেশে। গতি পায় ‘ভারতীয় পণ্য বয়কট,’ ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ ও ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন। বিতর্কিত নির্বাচন করেও আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার জন্য দায়ী করা হয় ভারতের সমর্থনকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতির ধারণা সূচকে’ বাংলাদেশ বরাবরই নিচের দিকে অবস্থান করে। ২০২৪ সালের শুরুতে সংস্থাটি জানায়, আগের বছরে জরিপ অনুযায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেশটির অবস্থান দশম।

বিদায়ী বছরে ঢাকার বেইলি রোডের একটি বহুতল ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জন নিহত এবং অন্তত ৭৫ জন আহত হয়। ঘূর্ণিঝড় রেমাল ২৬ ও ২৭ মে বাংলাদেশে আঘাত হানে। এ ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারান সাতজন। ভারতকে ফাইনালে হারিয়ে ৮ ডিসেম্বর এসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ শিরোপা জেতে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল।

গেল বছর সাবেক সেনা ও পুলিশপ্রধানের দুর্নীতিসহ আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজনের দুর্নীতি-সংক্রান্ত খবর ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এর মধ্যে কোরবানির ঈদের আগে একটি এগ্রো ফার্ম থেকে কোরবানি উপলক্ষে ‘১৫ লাখ টাকার’ একটি ছাগল কিনতে গিয়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দেন মতিউর রহমান নামে এক রাজস্ব কর্মকর্তার ছেলে। ভাইরাল হওয়া খবরের সূত্র ধরে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, তার পিয়ন দুর্নীতি করে চারশ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই তথ্য জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে জবাবদিহির অভাবে নজিরবিহীন দুর্নীতি আর গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ায় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলোর অত্যাচারে জনজীবন পিষ্ট হয়েছে। ওই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন অনেক বছর সফল হয়নি।

এ অবস্থায় সরকারি চাকরিতে কোটার বিরুদ্ধে ছাত্রদের একটি আন্দোলনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে বহু মানুষ নিহত, আহত হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে ৫ আগস্ট তীব্র আন্দোলনের তোপে ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

দেশ তিন দিন সরকারবিহীন থাকার পর ছাত্রনেতাদের আমন্ত্রণে বিদেশ থেকে এসে ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার পদ নিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

রাষ্ট্রদ্রোহীর অভিযোগে বিদায়ী বছরের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠায় চট্টগ্রামের একটি আদালত। চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের রিমান্ড শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতসংলগ্ন এলাকায় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুরো ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় ওঠে।

এ ঘটনা ছাড়া অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা পর্যায় থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচকভাবে মিথ্যা, অতিরঞ্জিত ও কাল্পনিক বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি মুখরোচক খবর প্রকাশ অব্যাহত রয়েছে। এতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। অবস্থার উন্নতিতে দুই দেশের কূটনৈতিক নানা পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা এখনো চলমান।

বছরের শেষের দিকে ২৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় দেশবাসী অবাক হন। এতে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের অনেক নথি পুড়ে যায়।

উত্তরাধিকার সূত্রে অন্তর্র্বর্তী সরকার অর্থনীতি কোন হালে পেয়েছে, তা উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত শ্বেতপত্রের পরতে পরতে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে উন্নয়ন বাজেটের ৪০ শতাংশ অর্থ ‘তছরুপ’, প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে ‘পাচার’; অনিয়ম-কারসাজি করে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার থেকে অর্থ লোপাট; বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির ৩ বিলিয়ন ডলার অবৈধ লেনদেনসহ সব খাতে দেদার ‘ঘুষ ও দুর্নীতির’ চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে ৪০০ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে।

বছর জুড়ে অর্থনীতির সবই যে আশাহত করার মতো ছিল, তা নয়। খারাপ হওয়ার আভাস দিয়েও অর্থনীতিতে স্বস্তি ধরে রেখেছে রপ্তানি আয়। আর রেমিট্যান্স দেখিয়েছে আশার জায়গা।

আগের বছরগুলোয় ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন খাতে লুটপাট, অর্থ পাচার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটসহ বিভিন্ন কারণে ২০২৪ ছিল অর্থনীতির জন্য চরম সংকটের বছর। বছরের শুরু থেকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে মানুষের নাভিশ্বাস ছিল। এর মধ্যেও ভোটের আগে-পরে ‘অলিগার্ক’খ্যাত সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নিয়ে যান। বিগত সময়ের আর্থিক খাতের এসব অপরাধের জের ও বৈদেশিক ঋণের চাপে দেশের অর্থনীতি এখনো ভুগছে।

সরকার পতনের পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় শুধু গরিব নয়, মধ্যবিত্তের বিরাট অংশের মানুষ অতিশয় কষ্টের মধ্যে পড়ে। সরকারের নানা উদ্যোগের ফলে যদিও সেই পরিস্থিতির এখন উন্নতি হয়েছে। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে পুরনো ব্যাধি চাঁদাবাজি, কারসাজি ও সিন্ডিকেশনে এখনো হাত পড়েনি।

এ ছাড়া বহু থানার অস্ত্র লুট হওয়ায় ও জেল থেকে দুর্র্ধষ আসামি জামিনে ছাড়া পাওয়ার অপরাধ বৃদ্ধি ও জননিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব পালন সম্পূর্ণ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ থাকবে।

ত্রয়োদশ নির্বাচন অনুষ্ঠান অন্তর্র্বর্তী সরকারের বড় কাজ। আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চাপ সৃষ্টিকারী নেতারা শেখ হাসিনার শাস্তির আগে নির্বাচন নয়, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে বলে বক্তৃতা দিচ্ছেন। বছরের প্রথমভাগেই নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি জমে উঠবে অনুমান করাই চলে এবং আওয়ামী লীগের ভূমিকা ও অবস্থান কী হবে, সেটাও লক্ষ করার বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তার সময়ের জুলুম-নির্যাতনের ঘটনাগুলো আরও ব্যাপকভাবে সামনে আসতে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম গোপন বন্দিশালা, যেখানে মানুষকে গুম করে দিনের পর দিন আটকে রাখা হতো। ৫ আগস্টের পর ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পাওয়া গোপন বন্দিশালা থেকে ছাড়া পান অনেকেই। যারা সেখানে অমানবিক দিন পার করেছেন বছরের পর বছর। গুম হওয়া অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ। যাদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছে কমিশন।

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ যেসব দল গত ১৫ বছর চাপের মুখে ছিল, সেসব দল এখন মুক্ত পরিবেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাত সংস্কারে ইতিমধ্যে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ছয়টির কাজ শেষপর্যায়ে। বাকিগুলোর কাজ শেষ হবে ফেব্রুয়ারি। তবে সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন নাকি নির্বাচনের পরে সংস্কার, সে প্রশ্নে দল, সরকার ও আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, যা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যাদের নেতৃত্বে জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা থেকে দেশ মুক্তি পেয়েছে। তারা ইতিমধ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে শতাধিক থানায় কমিটি করেছে। তাদের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে। নতুন দল যদি হয় তা ২০২৫-এর প্রথম প্রান্তিকেই হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এই আদালত। এখন তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছে অন্তর্র্বর্তী সরকার।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা : খ্রিস্টীয় নববর্ষ-২০২৫ উপলক্ষে দেশে ও প্রবাসে বসবাসকারী সব বাংলাদেশিসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘সময়ের চিরায়ত আবর্তনে খ্রিস্টীয় নববর্ষ আমাদের মাঝে সমাগত। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জিকা বহুল ব্যবহৃত। খ্রিস্টাব্দ তাই জাতীয় জীবনে এবং প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুনের আগমনী বার্তা আমাদের উদ্বেলিত করে, নব উদ্যমে সুন্দর আগামীর পথচলার জন্য অনুপ্রেরণা জোগায়। নতুন বছরের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নতুন সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে উন্নতির নতুন শিখরে আরোহণে অঙ্গীকারবদ্ধ বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকার।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত