বাংলাদেশের নারী ফুটবল জাগরণের মূল কৃতিত্বের দাবিদার কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। ২০২৩ সালে বাফুফে ছেড়ে গেলেও নতুন বছরে আবার ফিরে এসেছেন দুটি নতুন দায়িত্ব নিয়ে। ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ও এলিট একাডেমির প্রধান হিসেবে কী ভাবছেন তিনি, সেগুলো শুনেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ
বাফুফেতে আবার ফিরলেন, আপনার অনুভূতিটা কেমন?
গোলাম রব্বানী ছোটন : অনুভূতি অবশ্যই ভালো।
মাঝে চলে গিয়েছিলেন, ফেরার পেছনের কারণ কী?
ছোটন : বাফুফের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। উনাদের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে এখন ফুটবল ফেডারেশনে কাজ করার পরিবেশ আছে। আমার বাফুফের সঙ্গে শুরুর অধ্যায়েই ইয়ুথ পর্যায়ে কাজ করেছি। এরপর জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করেছি, মেয়েদের দলটি নিয়েও কাজ করেছি আপনারা জানেনই। বড় বড় যারা কোচ তারা পরিণত হওয়ার পর একাডেমি পর্যায়ে কাজ করেন। খেলোয়াড় তৈরির কাজটি অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। আমারও তেমন ইচ্ছা ছিল। কাজের জন্য এমন একটা জায়গা যদি পাওয়া যায় যেখানে খেলোয়াড়রা আসবে অনেক আশা নিয়ে। তারা ভালো ফুটবলার হবে, বড় বড় ক্লাবে খেলবে, জাতীয় দলে যাবে। আমার নতুন জায়গায় এই কাজটি করার সুযোগ আছে। এভাবে যদি দেশের জন্য ফুটবলার তৈরির কাজ করা যায় তাহলে এখানে অনেক সন্তুষ্টি আছে।
বাফুফে এলিট একাডেমিতে বর্তমান যে সুযোগ-সুবিধা আছে, তা দিয়ে কি সত্যিকার অর্থে এই চ্যালেঞ্জ সামলানো কিংবা স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন?
ছোটন : ফুটবল ফেডারেশন তো চায়ই সারা বাংলাদেশ থেকে নতুন প্রতিভাগুলোকে তুলে নিয়ে আসতে। বর্তমান সভাপতি তাবিথ আউয়াল, সহসভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এবং সংশ্লিষ্ট আর যারা আছেন তারা দায়িত্বে এসেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের বিষয়ে ভাবছেন। যেমন আবাসন সংকটে সমাধানের জন্য এলিট একাডেমির কাজ যশোরের শামসুল হুদা একাডেমিতে নিয়ে গিয়ে চালানোর কথা ভাবা হচ্ছে। আমার মনে হয়েছে ফেডারেশনের চিন্তা রয়েছে বর্তমান অবস্থা থেকে আরও ভালো করার। সেই সঙ্গে আমরা যারা থাকব আমাদেরও লক্ষ্য ঠিক রাখতে হবে। এখানে যারা আসবেন খেলোয়াড় হওয়ার জন্য তাদেরও নিজের জীবন গড়ার জন্য একইভাবে সচেতন থাকতে হবে। তারা যেন ঠিক পথে থাকে সেটি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
নাম-ডাক হয়ে গেলেই তরুণদের ভেতর পথ হারিয়ে ফেলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টের অংশ হিসেবে মাঠে ও মাঠের বাইরে এ বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
ছোটন : একজন খেলোয়াড় যখন একাডেমিতে আসে তখন তারা একেবারেই নিষ্পাপ থাকে। ওই খেলোয়াড়টিকে ওপরে ওঠানোর মতো করে গড়ে নেওয়াই আমাদের কাজ। একই সঙ্গে শুধু ভালো খেলোয়াড় না ভালো মানুষ হিসেবেও যেন তারা গড়ে ওঠে সেটি নিশ্চিত করাও আমাদের অন্যতম কাজ। আর এই উপলব্ধি যেন তার মননে গেঁথে যায় তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও আমার কাজ বলে আমি মনে করি।
প্রতিভা অনুসন্ধান করাও তো ডেভেলপমেন্টের একটা অংশ। এ নিয়ে আপনার আপাত পরিকল্পনা কী?
ছোটন : সারা দেশে আমাদের খেলোয়াড় ছড়িয়ে আছে। সামনেই অনূর্ধ্ব-১৫ বিভাগে আমাদের বড় টুর্নামেন্ট রয়েছে। ৬৪টি জেলা এতে অংশ নেবে। সেখান থেকে বিপুল সংখ্যক প্রতিভাবান ফুটবলার আমাদের কাছে আসতে যাচ্ছে। শুধু অন্বেষণ নয়,
ওই খেলোয়াড়গুলো এলিট একাডেমিতে এসে যেন পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ পায় সেটিও আমাদের এলিট একাডেমির দায়িত্ব।
দেশের ফুটবলে ছোটনকে সবাই চেনে আসলে উইমেন্স টিমের সফল কোচ হিসেবে। এখন আপনি ছেলেদের নিয়ে কাজ করবেন। দুটোর মধ্যে কি মূল কোনো বিভাজন আছে?
ছোটন : মূল পার্থক্যের জায়গা আসলে আমার দৃষ্টিতে অন্যরকম। যখন মেয়েদের নিয়ে কাজ করেছি তখন দেশের ফুটবলে পরিবেশটাই আসলে প্রতিকূলে ছিল। সেটা উতরে গিয়ে ওদের ফুটবল খেলতে হয়েছে। সেই তুলনায় ছেলেদের ফুটবলে প্রতিবন্ধকতা অনেকটাই কম। মেয়েদের বেলায় দেখা গিয়েছে অনেকে এখানে এসেই বেসিক শিক্ষাটুকু পেয়েছে। প্রতিভা অন্বেষণ করে যেই ছেলেরা আমাদের কাছে আসে তারা মেয়েদের একই বাস্তবতার তুলনায় অনেকটাই এগোনো থাকে। একাডেমিতে আসার পর ছেলেগুলোকে যদি ভালো পরিবেশ ও পরিচর্যা দেওয়া যায় তাহলে আমার মনে হয় ওরা অনেক ভালো করবে।
মনে কিছুটা ক্ষোভ নিয়েই বাফুফে ছেড়েছিলেন। এরপর অনেক পর্যায় থেকে আপনাকে অনুরোধ করা হলেও ফেরেননি। নতুন কমিটি আসার পরে বাফুফেতে আবার ফিরলেন। মাঝের সময়টুকু আপনার কেমন কেটেছে?
ছোটন : একটানা ১৪ বছর কাজ করার কিছু মানসিক ধকলের জায়গাও রয়েছে। আমারও কিছু বিশ্রামের দরকার ছিল, পরিবর্তনেরও প্রয়োজন ছিল। আমি সেনাবাহিনীতে কাজ করছি খুব বেশিদিনও হয়নি। এখন নতুন নেতৃত্ব আমাকে প্রয়োজন বলে মনে করেছেন। সেইভাবে আমার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। উনাদের সঙ্গে করা আলোচনা আমার ভালো লেগেছে বলেই আমাকে আবার এখানে দেখতে পাচ্ছেন।
বাফুফেতে ফিরলেও নারী দলের সঙ্গে এখন কাজ করা হবে না। মিস করবেন কি?
ছোটন : চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী আমি শুরুতে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে এবং এরপর জাতীয় দলেও কাজ করেছি। এরপর আমাকে নারী বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি চেয়েছিলাম দলটার যেন উন্নতি হয়। আমি যখন দায়িত্ব ছেড়েছি তখন জাতীয় নারী দল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দল। সেনাবাহিনীতেও আমি নতুন একটি দল নিয়ে কাজ করেছি। সেখানেও একই উদ্দেশ্য ছিল এবং কিছুটা উন্নতিও হয়েছে। এখন এখানেও উদ্দেশ্য ওই একই। খেলোয়াড়রা যেন বেনিফিটেড হয়। ফুটবল ফেডারেশনের যে লক্ষ্য- একাডেমির মাধ্যমে দেশ ভালো ফুটবলার পাক- সেটি যেন পূর্ণ হয়।
ই্য়ুথ ফুটবল নিয়ে বড় দাগে একটা অভিযোগ রয়েছে যে আমরা বয়স লুকাই। এ ব্যাপারে কী বলবেন?
ছোটন : আমার সহ-সভাপতির সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে আমরাও এবার সতর্ক। একটা ফুটবলারের বেসিক অংশটুকুই গড়ে ওঠে ১২ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। আপনি বেশি বয়সী একজনকে ওই পর্যায়ে খেলালে তার বেসিকই গড়ে উঠবে না। ঠিক বয়স অনুসরণ করা হলে এই জটিলতাগুলো হবে না। তখন সেই খেলোয়াড়টিই যখন জাতীয় দলে আসবে তখন নৈপুণ্যগত জায়গায় সমস্যা হবে না। আসলে মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে প্রতিটি ক্ষেত্রে। কেবল বাফুফে সজাগ থাকলে চলবে না, বয়সের ক্ষেত্রে শতভাগ সৎ থাকতে হবে একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকেই। নইলে বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কিছু সাফল্য এলেও ভুগতে হবে জাতীয় দলকেই।
বিকেএসপি এবং অন্যান্য একাডেমিতেও ফুটবলার গড়ার কাজ করা হয়। বাফুফে এখন থেকে কীভাবে সমন্বয় করবে?
ছোটন : অন্যান্য একাডেমি বিশেষত বিকেএসপির সঙ্গে বাফুফের সবসময়ই একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আর এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে যে ফুটবল একাডেমিগুলো রয়েছে সেগুলোর সঙ্গে বাফুফের সম্পর্ক আরও উন্নত করার চেষ্টা আমি করব। যাতে করে সেখানকার প্রতিভাগুলোরও সেরা প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত হয়। দিনশেষে যেন বাংলাদেশের ফুটবল উপকৃত হয় এবং বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নতি হয়।
