মানুষের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কিনে থাকে। কখনো প্রয়োজন ছাড়া আবার কখনো স্থাপনের প্রক্রিয়া ঠিক না করেই এসব কেনা হয়ে থাকে। ফলে কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি হয়ে থাকে। বাক্সবন্দি অবস্থায় এসব নষ্ট হয় বা এগুলোর ওয়ারেন্টি চলে যায়। বিকল বা নষ্ট যন্ত্র মেরামতে বিপুল অর্থ খরচ হয়।
শুধু কমিশন পাওয়ার আশায় এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে সরকারের প্রচুর অর্থের ক্ষতি হয়। চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা রয়েছে। কিন্তু এটা না মেনেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপো (সিএমএসডি) যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রাখছে।
ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ মোট আটটি হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনহীন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। বছরের পর বছর বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে থেকে সরকারের ২৮ কোটি ৩৮ লাখ ৪৪ হাজার ৮২০ টাকা ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের রিপোর্টে এ অনিয়মের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সিএমএসডির উপপরিচালক (পিঅ্যান্ডসি) মো. হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিএমএসডি নিজ উদ্যোগে কোনো যন্ত্রপাতি কেনে না। এ প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখায় লাইন ডিরেক্টর আছে। তারা সিএমএসডিতে চাহিদাপত্র পাঠায়। সিএমএসডি এক্সপার্ট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় চাহিদা মোতাবেক যন্ত্রপাতি কিনে দেয়। যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঠিক করে।’
চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশিকা আছে। ২০১৪ সালের ওই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কেনার পর তা যেন বাক্সবন্দি হয়ে না থাকে, যন্ত্রপাতি স্থাপনের স্থাপনাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা ঠিক করেই যন্ত্রপাতির জন্য চাহিদাপত্র পাঠাতে হবে। কিন্তু চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র না পাঠালেও যন্ত্রপাতি পাঠায় সিএমএসডি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজে উদ্যোগী হয়ে যন্ত্রপাতি কেনে।
সিএমএসডি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনে চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে। আবার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগেও যন্ত্রপাতি কিনে থাকে। যন্ত্রপাতি কেনার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কমিশনবিষয়ক গোপন চুক্তি থাকে। এ কারণেই প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়। কম দামি যন্ত্রপাতি বেশি দামেও কেনা হয়। এজন্য কমিশন পেয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে অনিয়ম বাড়তেই থাকে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের কার্যক্রমের ওপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তর অডিট চালায়। অডিটে যেসব অনিয়ম উঠে আসে সেগুলোর মীমাংসার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যে জবাব দিয়েছে, তা সন্তোষজনক না হওয়ায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অর্থ ফেরত নিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অডিট রিপোর্ট জাতীয় সংসদের হিসাব-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য গত ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হয়।
অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ১২ জুন সিএমএসডি থেকে ৪ কোটি ৯২ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা মূল্যের হিতাচি ব্রান্ডের একটি ৬৪ সøাইস সিটিস্ক্যান মেশিন গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে মেশিন চালানোর মতো জনবল না থাকায় তা বাক্সবন্দি থাকে। বাক্সবন্দি অবস্থায় মেশিনের ওয়ারেন্টি পিরিয়ড চলে যায়। মেশিন বসানো না হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো অর্থই দেওয়া হয়েছে। আবার হাসপাতালে চাহিদা না থাকলেও ২০১৯ সালের জুন মাসে একটি এক্স-রে মেশিন সরবরাহ করা হয়। এটি কিনতে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া সিএমএসডি থেকে আরও চারটি সিটিস্ক্যান মেশিন পাঠানো হয়, এতে খরচ হয়েছে ৪১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ টাকা। সিটিস্ক্যান মেশিন ব্যবহার না করার বিষয়ে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেলের বক্তব্য হলো, হাসপাতালটিতে মাত্র একজন রেডিওলজিস্ট, তাই মেশিন বসিয়েও চালু করা সম্ভব হয়নি।
শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেশিন স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের আগস্টে নষ্ট হয়ে যায়। মেশিন মেরামতের জন্য ন্যাশনাল ইলেক্ট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্টে (নিমিউ) চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা মেশিন দেখে একটি বাজেট দিয়েছে। বাজেট প্রস্তাব এখন মন্ত্রণালয়ে। আমরা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। অনুমোদন পেলেই মেরামতের টেন্ডার আহ্বান করা হবে।’
ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : ২০১৪ সালের জুন মাসে ১২ কোটি ১৫ লাখ টাকার ইরিডিয়াম ১৯২ গ্র্যাডি থেরাপি মেশিন কেনা হয়। মেশিনটি চালানোর উপযুক্ত জনবল না থাকায় ব্যবহার করা যায়নি। এরপর ২০১৭ সালের ৬ জুন ৮ লাখ টাকায় একটি অপারেটিং মাইক্রোস্কোপ ও ১ জুলাই ৬০ হাজার টাকায় একটি কন্টিনিউয়াস ইসিজি মেশিন কেনা হয়। যন্ত্রগুলো বাক্সবন্দি। ফলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত এবং সরকারের ১২ কোটি ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. হুমায়ুন কবীরের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল : এ হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগে ২৩টি শয্যা রয়েছে। এসব শয্যার বিপরীতে ২৫টি ডায়ালাইসিস মেশিন সচল রয়েছে। তারপরও সিএমএসডি থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারটি ডায়ালাইসিস মেশিন ও একটি কোলনোস্কোপি মেশিন পাঠানো হয়। মেশিনগুলো বাক্সবন্দি। প্রয়োজন ছাড়াই এসব মেশিনের জন্য ওয়ার্সি সার্জিক্যালকে ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সিএমএসডি থেকে পাঠানো ৯৮ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের আরও ছয়টি ডায়ালাইসিস মেশিন হাসপাতালে বাক্সবন্দি। সরকারের ২ কোটি ৬০ লাখ ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
দিনাজপুর আব্দুর রহিম মেডিকেল : সিএমএসডি থেকে এ হাসপাতালে লো টেম্পারেচার প্লাজমা স্টেরিলাইজার মেশিন পাঠানো হয়। মেশিনটি ক্রয়ের কোনো রেকর্ডপত্র নেই। ব্যবহার না করায় এটি ১১ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে। একই হাসপাতালে ২৮ লাখ ৮২ হাজার টাকার সিআর, প্রিন্টার ও ফিল্ম মেশিন বাক্সবন্দি।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল : এ হাসপাতালের জন্য ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯ লাখ টাকায় একটি ইটিটি মেশিন উইথ ট্রেডমিল আরগোমিটার কেনা হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় মেশিনটি ব্যবহার করা যায়নি। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ ৩ লাখ ১২ হাজার ৯০০ টাকার একটি ডেন্টাল এক্স-রে মেশিন কেনা হয়। এটিরও ব্যবহার হয়নি। ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল হাসপাতালে একটি কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। ১ কোটি ৫২ লাখ ৯০ হাজার ৯৭৯ টাকার একটি অ্যাম্বুলেন্স ২০২০ সালের ১৭ অক্টোবর পাঠানো হয়। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স চালানোর নীতিমালা না থাকায় এটি চালানো হয়নি।
২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৮৫৫ টাকার একটি কার্ডিয়াক অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়। সেটিও চালানো হয়নি।
চট্টগ্রাম মেডিকেলে ব্যবহারের আগেই মেরামত করতে হয় মেমোগ্রাফি : ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ সিএমএসডি থেকে একটি ডিজিটাল মেমোগ্রাফি মেশিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সরবরাহ করা হয়। মেসার্স নিউ টেক জিপি থেকে। মেশিনটি স্থাপনের পর ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিকল হয়ে যায়। মেশিনটির ওয়ারেন্টি ২০২১ সালের ১ আগস্ট শেষ হয়ে যায়। এর পেছনে ব্যয় হয় ১ কোটি ৬৬ লাখ ১ হাজার ৯৬০ টাকা। মেশিনটি মেরামতের জন্য ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সিএমএসডিতে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, সিএমএসডি থেকে সরবরাহ করা মেশিনটিতে গ্যাসলাইন সিস্টেম না থাকায় সেটি দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মেশিনটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন। চিঠি পেয়ে সিএসএমডি থেকে গ্যাস পাইপলাইনের যন্ত্রাংশ সংশোধনের জন্য নিমিউতে পাঠানো হয়। সিএমএসডি ২০১৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ৭৬ লাখ ১৭ হাজার ৫৬৪ টাকায় একটি কার্ডিয়াক সি-আরএম এক্স-রে কিনে হাসপাতালে পাঠায়। এ ছাড়া প্রয়োজন ছাড়াই ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকায় চারটি ডিফিব্রিলেটর মেশিন কিনে। ২০২০ সালের মার্চ মাসে কেনা এসব মেশিনের একটি ব্যবহার করা হলেও তিনটি মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে।
বরিশাল মেডিকেলে প্রয়োজন ছাড়াই এক্স-রে মেশিন সরবরাহ : বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়টি এক্স-রে মেশিন থাকার পরও সিএমএসডি ৭০ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে একটি এক্স-রে মেশিন পাঠায়। চাহিদা নেই তবু পাঠিয়েছে সিএমএসডি।
১৮ কোটি মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই: সিইসি
আদালতের শৌচাগারের পাশেও রাখা হচ্ছে মামলার নথি
এক মাসে রেললাইন সিগন্যালের ২০ মোটর চুরি, গতি হারাচ্ছে ট্রেন
চুলা না জ্বললেও দিতে হচ্ছে গ্যাসের বিল
রাতে স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন খালেদা জিয়া
সৌদিতে আবারও ১৯ হাজারের বেশি অবৈধ প্রবাসী গ্রেপ্তার