আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিকল্প কী?

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৩ এএম

পুরান ঢাকার বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বসত অস্থায়ী বিশেষ আদালতের এজলাস। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলাসহ ওই এলাকার মানুষের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দীর্ঘ ১৫ বছর এজলাস চলায় ক্ষিপ্ত ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসীও। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মাঠ প্রাঙ্গণের আদালত কক্ষে দেওয়া হয় আগুন। গত বৃহস্পতিবার মাঠে অস্থায়ী এজলাস বসা কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এজলাসে আগুন, মাঠের প্রধান ফটকসহ একাধিক গেটে তালা দেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আদালতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় চার দিন চলে গেলেও এর কোনো কারণ জানা যায়নি। কোনো মামলা বা অভিযোগ করা হয়নি বলেও জানায় পুলিশ।

এজলাসের আগুনের ঘটনায় শুনানির তারিখও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো নির্ধারিত স্থান ঠিক করা হয়নি এজলাসের। দীর্ঘ সময় এই আলিয়া মাদ্রাসা মাঠ প্রাঙ্গণে এজলাসের শুনানি হলেও এখন এই মাঠের বিকল্প কোন স্থান নির্ধারণ করা হবে সেই বিষয় নিয়ে চিন্তিত।

এ বিষয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষে আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনার পর বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আসামির সংখ্যায় দেশের ফৌজদারি ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি হওয়ায় মামলাটি কেন্দ্র করে নিরাপত্তার প্রসঙ্গটি আসে। এজন্য পিলখানায় হত্যাকান্ড ও বিস্ফোরণের মামলাটি বকশীবাজারের এই জায়গাটিকে অস্থায়ী আদালত হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। বিচারকাজের সময় বিডিআরের তৎকালীন জওয়ানসহ অন্য আসামিদের প্রতিটি ধার্য তারিখে হাজির করা হতো। ২০১০ সাল থেকে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় হয়। তবে, তখন এখানে বিচারকাজ নিয়ে কারও জোরালো আপত্তি ছিল না বলে জানান আইনজীবীরা। এরপর এই অস্থায়ী আদালতে পিলখানার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলা চলতে থাকে। ১ হাজার ৩০০-এর বেশি সাক্ষীর এ মামলাটি এখন রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে।

এ ছাড়া একই আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, নাইকো মামলা, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। তবে, বিভিন্ন সময় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির মামলার বিচারকাজ অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়। এসব মামলার আসামি ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ অনেকে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ এখানে চলে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এ মামলায় প্রতিটি ধার্য তারিখে খালেদা জিয়াকে কড়া নিরাপত্তায় হাজির করা হতো।

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, ১৪ বছরে এই অস্থায়ী আদালতে বেশ কিছু আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ নিয়ে কারও জোরালো আপত্তি ছিল না। পিলখানার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. বোরহান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে বড় বড় মামলার শুনানি হয়েছে। কিন্তু কখনোই কারও কোনো আপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা আসেনি। যখন বিএনপি নেতাদের বিচার হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির আপত্তি থাকার কথা, কিন্তু তাদের থেকেও জোরালো আপত্তি আসেনি। কিন্তু এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কারা কেন কী করেছে, তা আমরা জানি না।’

সাড়ে ১৫ বছর আগে পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় বিস্ফোরক আইনের মামলায় গত বৃহস্পতিবার ওই আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ ও জামিন শুনানির কথা ছিল। তবে মাদ্রাসা মাঠে আদালত বসানোর প্রতিবাদে রাতভর আন্দোলনের পর সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখান আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের মধ্যেই রাতে আগুনে পুড়েছে অস্থায়ী আদালতের এজলাস কক্ষ। পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতের এজলাস কক্ষটি কারা পুড়িয়ে দিয়েছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আগুনের কারণ নিয়ে মুখ খুলতে চায় না ফায়ার সার্ভিস। এই অগ্নিকা- বা বিক্ষোভের বিষয়ে কোনো মামলা বা অভিযোগও দেয়নি কেউ। তাই চার দিন পার হলেও কোনো হদিস মেলেনি এ ঘটনার।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. আমিনুল কবীর তরফদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজলাসে আগুনের ঘটনায় কোনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি। তবে এই এজলাসে অগ্নিকান্ডের ঘটনা গত ৫ আগস্টেও হয়েছে। তখনো ওখানকার অনেক কিছু পুড়ে গিয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার ভোরে যে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে, এর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আমরা যতটুকু জেনেছি, ওই কক্ষ থেকে ধোঁয়া বের হয়েছে। কিন্তু সবাই বলছেন আগুন লেগেছে। ফায়ার সার্ভিসও বলেছে তারা গিয়ে আগুন দেখেনি। তবে ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বলছেন, একদল ব্যক্তি গত বুধবার রাতে ওই এজলাসের কক্ষে আগুন দিয়েছে।’

গতকাল স্থানীয় কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে জানান, আদালত সরানোর দাবিতে বুধবার আলিয়ার মাঠের সব প্রবেশ ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় মাদ্রাসার হল থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এরই মধ্যে ভোরে বিচারকের এজলাস কক্ষে আগুন লাগে। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত, তা কেউ দেখেননি বলেও জানান।

অস্থায়ী আদালত বসানো মাঠটি নিয়ে পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে আলিয়া মাদ্রাসার দ্বন্দ্ব বহুদিনের উল্লেখ করে আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী মুক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় তিন মাসের জন্য অস্থায়ী বিশেষ আদালত বসায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে এখানেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিচারকাজ করা হয়। দীর্ঘদিন বিচারকাজ চলায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ আশপাশের মানুষ মাঠটি ব্যবহার করতে পারেননি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস ঘোষণা দিয়ে বসেন, মাঠটি সিটি করপোরেশনের। মাদ্রাসার মাঠ নিয়ে ষড়যন্ত্রের কারণেই শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছেন।

বিস্ফোরক আইনের মামলাটি ঢাকা মহানগর প্রথম অতিরিক্ত দায়রা আদালতে চলমান। আগুন ও ভাঙচুরের ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার আদালতে এসেছিলেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক মো. ইব্রাহীম মিয়া, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। ওইদিন পরিস্থিতি দেখে এখানে বিচারকাজ চলা সম্ভব নয় বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। পরে বিকেলে বিচারক এ মামলায় আসামিদের জামিন শুনানির জন্য ১৯ জানুয়ারি ধার্য করেন। তবে, এখন কোথায় এ মামলার বিচারকাজ চলবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি।

এ প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘সরকারিভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হয়নি। কোনো প্রজ্ঞাপনও পাইনি। তবে, আসামিপক্ষ থেকে দুটি জায়গার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর একটি বকশীবাজারের নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার এবং এখানে সম্ভব না হলে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগার।’

জানতে চাইলে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। কেউ হয়তো কথা প্রসঙ্গে বলে থাকতে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমাদের বক্তব্য হলো, আমাদের যে মূল আদালত (ঢাকা মহানগর আদালত এলাকা) সেখানে বিস্ফোরক মামলার বিচারকাজ শুরু হোক। কোনো কারণে সেখানে সম্ভব না হলে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেখানে বিচারকাজ হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত