সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন পেশা

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:১৫ এএম

ইসলামে ইবাদত ও ফরজ বিধিবিধানের ওপর যেমন গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তেমনি হালাল পেশা ও জীবিকা অর্জনকেও গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘অতঃপর নামাজ (পড়া) শেষ হলে জমিনে ছড়িয়ে পড় এবং (তারপর) আল্লাহর অনুগ্রহ (অর্থাৎ হালাল রিজিক) অন্বেষণ করো।’ (সুরা জুমুআ ১০) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইবাদতের পর হালাল রিজিক উপার্জন করা (সবচেয়ে বড়) ফরজ। (সুনানুল কুবরা ১১৬৯৫)

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে জীবিকা নির্বাহের গুরুত্ব স্পষ্ট। কিছু মানুষের ধারণা এই যে, সাহাবায়ে কেরাম শুধু আল্লাহর দ্বীনের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন এবং জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা এমন নয়। বরং বাস্তবতা হলো, নিঃসন্দেহে সাহাবায়ে কেরাম তাদের জীবনকে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় উৎসর্গ করেছিলেন আবার একই সঙ্গে তারা জীবিকা নির্বাহের কাজেও নিয়োজিত ছিলেন এবং ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়ম-কানুন শিখেছিলেন। হজরত ওমর (রা.) তার খেলাফতকালে এমন লোকদের বাজারে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছিলেন যারা ক্রয়-বিক্রয়ের নিয়ম-কানুন জানত না। মক্কার বেশিরভাগ সাহাবি ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং মদিনার বেশিরভাগ সাহাবি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জীবিকা নির্বাহে সাহাবায়ে কেরামের বিভিন্ন পেশা সম্পর্কে বিবরণী তুলে ধরা হলো।

কাপড়ের ব্যবসা

হজরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) কাপড়ের ব্যবসা করতেন। এ ব্যবসায় তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। তিনি মৃত্যুকালে ১ হাজার উট, ৩ হাজার ছাগল এবং ১০০টি ঘোড়া রেখে যান। (আল-মাআরিফ)

হজরত তালহা (রা.)-ও কাপড়ের ব্যবসা করতেন। বদর যুদ্ধের সময় তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। তাই বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তার দৈনিক আয় ছিল প্রায় ১ হাজার উকিয়া। (আল-মাআরিফ)

উটের ব্যবসা

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) মদিনার কাছে অবস্থিত জান্নাতুল বাকীসংলগ্ন বাজারে উটের ব্যবসা করতেন। তিনি নিজেই বলেছেন, আমি ‘আল-বাকী’ নামক বাজারে দিনারের বিনিময়ে উট বিক্রি করতাম। কিন্তু মূল্য গ্রহণের সময় দিনারের পরিবর্তে দিরহাম নিতাম। আবার কখনো দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিনার নিতাম। অর্থাৎ আমি কখনো এটার পরিবর্তে ওটা এবং কখনো ওটার পরিবর্তে এটা গ্রহণ করতাম। অতঃপর আমি রাসুলুল্লাহর (সা.)-এর নিকট আসলাম। তিনি তখন হাফসা (রা.)-এর ঘরে ছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার কাছে জানতে চাই, আমি ‘আল-বাকী’ নামক বাজারে দিনারের বিনিময়ে উট বিক্রি করে দিরহাম গ্রহণ করি এবং দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিনার গ্রহণ করি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এরূপ গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই, তবে সেদিনের বাজার দরে গ্রহণ করবে এবং কিছু অমীমাংসিত না রেখে পরস্পর পৃথক হওয়ার আগেই তা করবে। (সুনানে আবু দাউদ ৩৩৫৪)

খাবারের ব্যবসা

হজরত হাতিব বিন আবি বালতাআ আল লাখমি (রা.) একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, তিনি খাবার জাতীয় দ্রব্য বিক্রি করতেন। মৃত্যুকালে তিনি চার হাজার দিরহাম এবং একটি ঘর রেখে যান। (তবাকাতে ইবনে সাদ ৩/১০৭)

সোনা-রুপার ব্যবসা

আবুল মিনহাল (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বারা ইবনে আজিব ও জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.)-কে সোনা-রুপার ব্যবসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা উভয়ে বললেন, আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর যুগে ব্যবসায়ী ছিলাম। আমরা রাসুল (সা.)-কে সোনা-রুপার ব্যবসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, যদি হাতে হাতে (নগদ) হয়, তবে কোনো ক্ষতি নেই। আর যদি বাকিতে হয় তবে জায়েজ নয়। (সহিহ বুখারি ২০৬০)

তীর-বর্শা ব্যবসা

হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) তীর খোদাই করতেন অর্থাৎ তীর বানাতেন। (আল মাআরিফ)

হজরত নওফাল বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা.) বর্শার ব্যবসা করতেন। (আত তারাতিবুল ইদারিয়্যাহ ২/২৯)

গোশতের ব্যবসা

হজরত ওমর বিন আস (রা.) গোশত বিক্রি করতেন। হজরত জুবায়ের বিন আওয়াম (রা.)-ও গোশত বিক্রি করতেন। (প্রাগুক্ত)

হজরত জুবায়ের (রা.) একজন বণিক ছিলেন এবং তিনি ব্যবসার মাধ্যমে প্রচুর উপার্জন করেছিলেন। তিনি গোশতও বিক্রি করতেন। একদিন কেউ হজরত জুবায়ের বিন আওয়াম (রা.)-কে জিজ্ঞেস করল, আপনি কীভাবে ব্যবসার মাধ্যমে এত টাকা উপার্জন করেছেন? উত্তরে তিনি বলেন, আমি দোষ বা ত্রুটিযুক্ত কোনো জিনিস ক্রয় করি না এবং লাভ করার ইচ্ছাও করি না। আল্লাহতায়ালা যাকে ইচ্ছা বরকত দান করেন। (আল ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব ১/৩০৭)

মুদারাবা (অংশীদার) ব্যবসা

আবদুর রহমান বিন ইয়াকুব (রহ.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ওসমান (রা.) তাকে মুদারাবাত হিসেবে সম্পদ দিয়েছিলেন যাতে তিনি এই সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করতে পারেন। এতে যা লাভ হতো তা দুজনে অর্ধেক অর্ধেক করে ভাগ করে নিতেন। (আল মুয়াত্তা ২৫৩৫)

শরিকি (শেয়ার) ব্যবসা

হজরত আবু মিলাক আনসারি (রা.) ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি নিজের মাল ও অন্যান্য লোকের মাল (শেয়ার) নিয়ে ব্যবসা করতেন। (আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবা ৭/৩৭৯)

গাছের ব্যবসা

হজরত সাদ বিন আয়েজ (রা.) বাবলা গাছের ব্যবসা করতেন। তিনি যখনই কোনো ব্যবসা করতেন, তাতে তার লোকসান হতো। কিন্তু যেদিন থেকে তিনি গাছের ব্যবসা শুরু করলেন সেদিন থেকে বহু মুনাফা অর্জন করতে শুরু করেন। তাই তিনি এই ব্যবসা অব্যাহত রাখেন। (আল-ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব ১/৩৫৬)

উট ভাড়ার ব্যবসা

আবু উমামা আত-তাইমি নামক এক ব্যক্তি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, (আমাদের পূর্ব থেকেই পেশা হলো) আমরা উট ভাড়া দিই। কিছু লোক হজের জন্য আমাদের উট ভাড়া করে, আমরা তাদের সঙ্গে যাই এবং হজ করি। আমাদের হজ কি আদায় হবে? উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা কি কাবা শরিফ তাওয়াফ, আরাফায় অবস্থান, পাথর নিক্ষেপ ও মাথা মুণ্ডন ইত্যাদি করো না? আবু উমামা আত-তাইমি বলেন, আমরা বললাম, কেন নয়, (আমরা তা করি)। তখন তিনি বললেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে এসে তাকে একই প্রশ্ন করলেন যে প্রশ্নটি তুমি আমাকে করেছ। এই আয়াত ‘তোমরা (হজের সময়ে ব্যবসা বা মজদুরি খাটার মাধ্যমে) স্বীয় প্রতিপালকের অনুগ্রহ (রিজিক) সন্ধান করলে তাতে তোমাদের কোনো গুনাহ নেই। (সুরা বাকারা ১৯৮) নাজিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) তার উত্তর দেননি। আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবী করমি (সা.) ওই ব্যক্তিকে ডেকে বলেন, তোমার হজ সহিহ হয়েছে। (মুসনাদে আহমদ)

দিরহাম-দিনার ওজনের ব্যবসা

হজরত সুওয়ায়েদ ইবনে কায়েস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এবং মাখরামা আবদি ‘হাজার’ (বাহরাইনের এক স্থান) থেকে কিছু কাপড় আমদানি করি। রাসুল (সা.) আমাদের কাছে এলেন এবং একটি পায়জামা ক্রয়ের জন্য দর স্থির করলেন। আমার কাছে একজন ওজনকারী ছিল। সে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওজন করে দিত। রাসুল (সা.) এ ওজনকারীকে বললেন, (মূল্য) ওজন করো এবং বাড়িয়ে দাও। (তিরমিজি ১৩০৫)

হস্তলিপি

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সাইদ ইবনে আস (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন মদিনার লোকদের লেখা শেখাতে। (আল ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবা ২/১০২)

মুয়াজ্জিন

হজরত বিলাল (রা.) মসজিদে নববিতে আজান দিতেন। রাসুল (সা.) ইন্তেকাল করলে তিনি সিরিয়া চলে যান এবং সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। (আল ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব ১/১১২)

হজরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা.) মুয়াজ্জিন ছিলেন। তিনিও মসজিদে নববিতে আজান দিতেন। তিনি হজরত খাদিজা (রা.)-এর মামাতো ভাই ছিলেন। (আল ইসতিয়াব ফি আসমাইল আসহাব ১/৩৫৬)

বিচারক

কয়েকজন সাহাবি ছিলেন যারা মানুষের নানা সমস্যার সমাধান ও বিচার করতেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হজরত ওমর (রা.)। হজরত আলী (রা.)-কে রাসুল (সা.) ইয়েমেনে বিচারক হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। হজরত মুয়াজ বিন জাবাল (রা.)-কে রাসুল (সা.) বিচারক হিসেবে আল-জুন্দে (যা ইয়েমেনে অবস্থিত) প্রেরণ করেছিলেন। (তিরমিজি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত