ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ৫ মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। আর এই অভ্যুত্থান পরবর্তী নানা ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। দেশকে গণতন্ত্র, নিরপেক্ষ নির্বাচন, দুর্নীতিমুক্ত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তিমুক্ত করতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করে। এর অংশ হিসেবে দুই ধাপে মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কার কমিশন গত বুধবার তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে।
চার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এখন সব দলের সঙ্গে আলোচনা করে গণ-অভ্যুত্থানের চার্টার (গণঅভ্যুত্থানের সনদ) তৈরি করা হবে, যার ভিত্তিতে হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই সনদ অনুসরণ করে পরবর্তী সরকার অগ্রসর হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
এদিকে এই চার সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে গত দুদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে কত সময় লাগবে? একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি ও প্রস্তুতি। ফলে আলোচনা শুরু হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংস্কার কমিশনগুলোর প্রস্তাব বা সুপারিশের প্রতিফলন কীভাবে ঘটবে?
একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে, এই চার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ কেমন হলো? এগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। সব কিছু মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা প্রায় সবাই অভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেছেন, সংস্কার কমিশনগুলোর দেওয়া সুপারিশগুলো ইতিবাচক। তবে এরমধ্যে সংবিধান সংশোধন, নির্বাচন কমিশন সংস্কারের কিছু কিছু জায়গায় অনেকেই আপত্তি জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংস্কার যত ভালোই হোক, এর বাস্তবায়ন না হলে কিছুই হবে না। তারা বলেন, আসলে অন্তর্বর্তী সরকার যত চেষ্টাই করুক আর ভালো ভালো যত ফর্মুলাই দিক— তাতে কোনো কাজ হবে না, যদি রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক না হয়।
এছাড়া আলোচনা উঠেছে, প্রথমত সংস্কার প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রের গণতন্ত্রীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম কি না। অর্থাৎ, আদৌ এমন প্রস্তাব করা হয়েছে কি না, যা বিদ্যমান রাষ্ট্র ও সংবিধানের এককেন্দ্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোয় লাগাম টানতে সক্ষম হবে? এ প্রসঙ্গে চূড়ান্ত মন্তব্য করার জন্য কমিশনগুলোর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনগুলোর অপেক্ষায় থাকতে হবে। দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি আরও জরুরি। প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করবে কারা ও কোন পদ্ধতিতে? বিশেষত সংবিধান সংস্কার কোন প্রক্রিয়ায় হবে? এ ক্ষেত্রে শুধু জাতীয় ঐকমত্য নয়, সঠিক পদ্ধতির গুরুত্বও অস্বীকার করা যাবে না।
এসব কিছু নিয়ে দেশ রূপান্তর কথা বলেছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে। তারা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি কমিশনের সুপারিশগুলোকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সেই সঙ্গে খাতভিত্তিক আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হলে তা ভালো হতো।
তবে এই সংস্কার কতটা বাস্তবায়ন হবে তা রাজনৈতিক দল এবং আমলাদের সদিচ্ছার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা।
সংবিধান সংস্কার কমিশন
রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি সংবিধানের সংস্কারে গঠিত কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতির মধ্যে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বাদ দিয়ে গণতন্ত্রের সঙ্গে নতুন চারটি মূলনীতি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশকৃত মূলনীতিগুলো হলো— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার এবং বহুত্ববাদ।
দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। উভয় কক্ষের মেয়াদ হবে চার বছর। আর একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদে দুবারের বেশি হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এ ছাড়া সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন।
দুদক সংস্কার কমিশন
দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করতে ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বে আট সদস্যের সংস্কার কমিশন গত ৩ অক্টোবর কার্যক্রম শুরু করে। তাদের তৈরি করা সংস্কার প্রতিবেদনে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সংবিধানের অঙ্গীকার, দুর্নীতিবিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়ন, ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা, ঘুষ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা ও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বাতিলের প্রস্তাবসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করা হয়েছে।
সেই সঙ্গে দুদককে শক্তিশালী, কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কমিশনারদের পদ বাড়ানো, নিয়োগ, সার্চ কমিটি, আইনের সংস্কার, বেতন বৃদ্ধি এবং প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি আরও কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। দুদকে শুধু আমলাদের নিয়োগে যে প্রধান্য দেওয়া হয়, তা থেকে সরে আসারও পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
জানতে চাইলে অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মো. মইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন যে সুপারিশ করেছে তারমধ্যে অনেকগুলো ভালো হয়েছে। তবে দুর্নীতির মামলায় যাদের সাজা হয় তারা উচ্চ আদালতে আপিল করে জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারসহ সমাজের অন্যান্য যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে। এ বিষয়ে একটি সুপারিশ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
সেই সুপারিশটি কেমন— তা ব্যাখ্যা করে মইনুল ইসলাম বলেন, যে কোনো ব্যক্তির দুর্নীতির দায়ে সাজা হওয়ার পর তিনি আপিল করলে তা নিষ্পত্তি না হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে যেন অংশ নিতে না পারেন। সমাজের কোনো পর্যায়ের প্রতিনিধি হতে পারবেন না তিনি। এক কথায় তাকে সমাজচ্যুত করার সুপারিশ করা হলে ভালো হতো।’
তিনি আরও বলেন, যেসব বিচারিক আদালতে দুদকের মামলার বিচার হয়, সেখানে অন্য মামলার বিচার হয়। ফলে বিচারকার্য শেষ হতে দেরি হয়। বর্তমানে আদালতে মাত্র ৯ শতাংশ দুর্নীতির মামলার বিচার করতে পারছে। দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ দ্রুত করতে আলাদা আদালত করতে হবে। সেটি প্রতি জেলায় না করা হলেও একাধিক জেলার জন্য করা যেতে পারে।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন
দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী পদে কোনো ব্যক্তি দু’বারের বেশি না থাকা, একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা হওয়া এবং কোনো আসনে ভোটারের ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনর্নির্বাচনসহ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি সুপারিশ করেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন।
নির্বাচনব্যবস্থা সুপারিশে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই টার্মে সীমিত করা। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দুবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের অযোগ্য করা। একই ব্যক্তি একসঙ্গে যাতে দলীয় প্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা হতে না পারেন, তার বিধান করা এবং দ্বৈত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ বন্ধ করা।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, দলনিরপেক্ষ, সৎ, যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তির রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা। জাতীয় সংসদের উভয় কক্ষের সদস্য এবং স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর নির্বাচকমণ্ডলীর ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা। কার্যকর সংসদের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংসদ সদস্যদের প্রত্যাহারের বিধান করা।
সংসদে উচ্চকক্ষ আইনসভার বিষয়ে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ১০০ আসন নিয়ে সংসদের উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করা। সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের হারের ভিত্তিতে (সংখ্যানুপাতিকভাবে) আসন বণ্টন করা। উচ্চকক্ষের নির্বাচনে প্রত্যেক দলের প্রাপ্ত আসনের ৫০ শতাংশ দলের সদস্যদের মধ্য থেকে এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ আসন নির্দলীয় ভিত্তিতে নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, মানবসেবা প্রদানকারী, শ্রমজীবীদের প্রতিনিধি, নারী উন্নয়নকর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ইত্যাদির মধ্য থেকে সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচিত করার বিধান করা। তবে শর্ত থাকে যে, দলীয় ও নির্দলীয় সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।
পুলিশ সংস্কার কমিশন
জুলাই-আগস্টে হতাহতের জন্য দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ এবং পুলিশ যেন রাজনৈতিক দলের বাহিনীতে পরিণত না হয় ও বলপ্রয়োগ না করতে পারে এমন সুপারিশ করেছে পুলিশ সংস্কার কমিশন।
এছাড়া বেআইনি সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও আসামিকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনার পাশাপাশি বাহিনী সংস্কারের জন্য ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জন চেয়েছে এই কমিশন।
সংস্কার প্রতিবেদন জমা হওয়ার পর ওইদিন বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে আগামী ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার।’
এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল আরেকটু যোগ করে বলেন, কমিশন যদি কাজ আগে শেষ করতে পারে, তাহলে হয়তো ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শুরু হতে পারে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, কমিশনগুলোতে সমন্বয়সহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তবে জানুয়ারির মধ্যেই এই চার কমিশনসহ মোট ছয়টি সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জানিয়ে দেওয়া হবে। বাকি দুটি কমিশন হলো বিচার বিভাগ সংস্কার ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।
গত ১৮ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে গঠন করা হয় গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম, নারী বিষয়ক ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন। এই কমিশনগুলোর প্রতিবেদন দেওয়ার কথা আছে আগামী মাসের শেষের দিকে।
কমিশনগুলো ওয়েবসাইট খুলে মতামত সংগ্রহ, অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ, মতবিনিময়, জরিপ ও লিখিতভাবে মতামত সংগ্রহ করেছে। সুপারিশমালা প্রস্তুতে এসব প্রস্তাব ও মতামত পর্যালোচনা করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা বাড়ানো এবং আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলো ইতিবাচক। রাজনীতিতে কালো টাকার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। আর তা না হলে গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলার কোনো অর্থ নেই।’
সাবেক এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘কিন্তু এই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। আবার, নির্বাচন কমিশনের উচিত এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখা যেন দলগুলো তাদের আর্থিক কার্যক্রম স্বচ্ছ রাখে।’
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। রাজনৈতিক দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে দেশ গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারবে না।’ গত দুই-তিন দশকের রাজনৈতিক চর্চায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় সবগুলো দলেই দেখা যায় কয়েক দশক ধরে শীর্ষ নেতৃত্বে একই ব্যক্তি। দলীয় কাউন্সিলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নেতৃত্বের পরিবর্তন হওয়ার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কাউন্সিলও হয় না নিয়মিত।
এসব বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসিরউদ্দিন জানান, তারা নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সব সুপারিশ পর্যালোচনা করবেন।
সংবিধান সংস্কার কমিটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরশেদ। তিনি বলেছেন কমিটির কিছু প্রস্তাব মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সংবিধানকে অবজ্ঞা এবং কিছু বিষয় আদালত অবমাননার শামিল।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সংবিধানে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র বাদ দেওয়ার প্রস্তাব অত্যন্ত নিন্দনীয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানের প্রস্তাবনা কখনো পরিবর্তন হয় না। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় তখনকার পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে। এমনকি সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব করে কমিটি যা বলেছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে হাইকোর্টের একটি রায়ে তা আবার ফিরে আসার পথে। অথচ সংস্কার কমিটি সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করেছে যা বিভ্রান্তিকর। কেননা সংবিধানে কখনো অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে কিছু নেই। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে বলে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এ ধরনের প্রস্তাব আদালত অবমাননার শামিল।’
সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ২১ বছর করার প্রস্তাব একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য করা হয়েছে উল্লেখ করে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা তাহলে পড়াশুনা বাদ দিয়ে এমপি হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করবে। স্নাতকে পড়া কোনো শিক্ষার্থী তার ভবিষ্যৎ চিন্তা বাদ দিয়ে রাজনীতিতে নেমে পড়বে। এটা আসলে কোনোভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর কিছু হবে না।’
তিনি বলেন, ‘হাইকোর্ট কোথায় থাকবে তা ইতিমধ্যে উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মামলায় ঢাকায় একটি হাইকোর্ট থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এটি মীমাংসিত বিষয়। কিন্তু সংস্কার কমিটি প্রতিটি বিভাগীয় শহরে হাইকোর্টের কথা বলেছে যা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে অবজ্ঞার শামিল।’
মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা এ ধরনের বিষয় সংবিধানে মৌলিক নীতি হিসেবে আছে। অর্থাৎ সরকার নাগরিকের এসব বিষয় নিশ্চিতে সাধ্যমতো চেষ্টা করবে। কিন্তু সংস্কার কমিটি এ বিষয়গুলোকে আবশ্যকীয় অধিকার করার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের সব মানুষকে ঘর দেওয়া বা এ ধরনের বিষয় নিশ্চিত করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের আছে কি না তাও দেখতে হবে।’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের চিন্তাভাবনায় রাজনৈতিক চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও ব্রিটেনের পর্যায়ে যেতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।’
জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি তাদের প্রস্তাব করেছে। কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এই অন্তর্বর্তী সরকারের কিন্তু সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা নেই। আর অধ্যাদেশের মাধ্যমে কিন্তু সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তন করা যায় না। সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেবল জাতীয় সংসদের। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার কমিটি কী প্রস্তাব করল তা নিয়ে গভীর কোনো আলোচনাও গুরুত্বহীন। আর ভবিষ্যতে যারা নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে যাবে তারা এ ধরনের প্রস্তাব পাস করবে কি না তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতি চায় ভারত
বিরোধী সমর্থক ও সাংবাদিকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে
সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছেন না দুই দেশে কলঙ্কিত টিউলিপ
ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি চুক্তির অনুমোদন
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে জনমনে অসন্তুষ্টি আছে: নুর