বাশারের অন্ধকূপ থেকে স্বজন ফিরে পাওয়ার আশা

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৫২ এএম

বাশার আল-আসাদ চলে গেছেন এবং সিরিয়া অবশেষে মুক্ত হয়েছে। তবে আসাদ সরকারের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত পতন এবং আমার দেশের মুক্তিতে আমি পুরোপুরি আনন্দিত হতে পারছি না। এর কারণ অনেক সিরীয়র মতো আমারও হৃদয়ে একটি গভীর ক্ষত রয়ে গেছে। আমার একজন প্রিয় মানুষ এখনো আল-আসাদের কারাগারে নিখোঁজ রয়েছে। আমার ছোট ভাই ইউসুফ ২০১৮ সালে নিখোঁজ হয়। তখন থেকেই আমি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।

ইউসুফ একসময় জীবন্ত ছিল, সে যেখানেই যেত তার হাসি সেই ঘরকে আলোয় ভরিয়ে দিত। সে গান ও ডাবকেহ নাচতে ভালোবাসত। সে খুব নিষ্ঠা ও যত্ন নিয়ে কবুতর পালন করত। ২০১৮ সালের আগস্টে সবকিছুই বদলে যায়। তাকে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য অভিযুক্ত করা হয় এবং আত্মসমর্পণের জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তার স্ত্রীকে আটক করে তৎকালীন সরকার। তারা তার স্ত্রীর ক্ষতি করবে, এই আশঙ্কায় সে রুকবান শরণার্থী শিবির থেকে দক্ষিণে তাদের আবাসস্থল সুয়েইদার দিকে রওনা হয়েছিলেন। পথিমধ্যে কোথাও সে নিখোঁজ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিটা দিন আমি তাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি।

ভাইকে ফিরে পেতে এতগুলো বছর ধরে আমি হাল না ছাড়তে এবং আশা না হারাতে নিজেকে উৎসাহ দিয়ে আসছি। তবে এখন আর আমার আঁকড়ে ধরার মতো কিছু নেই। যত দিন যাচ্ছে ততই অবশিষ্ট আশাটুকুও ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। গত মাসে সরকার পতনের পর, সম্প্রতি প্রকাশিত সুয়েইদা কারাগারের একটি ছোট্ট ভিডিও আমার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ভিডিওটিতে একজন পুরুষকে দেখা যায়। তার চেহারা, তার অঙ্গভঙ্গি এবং তার হালকা হাসি ঠিক ইউসুফের মতো দেখাচ্ছিল। আমি ভিডিওটা বারবার দেখেছি। এটা আমার বোনদের কাছেও পাঠিয়েছি। আমি এটি ইউসুফের স্ত্রীর কাছে এবং তাকে চিনতেন এমন প্রতিটি মানুষের কাছে পাঠিয়েছি।

এই ভিডিও দেখা প্রত্যেকেই বলেছেন : ‘এটা সেই। অবশ্যই এটা সে ছাড়া আর কেউ না।’ আমিও মরিয়া হয়ে বিশ্বাস করতে চাই যে ছবির মানুষটি সে-ই। সে বেঁচে আছে। খুব শিগগিরই আমরা তাকে আবার আলিঙ্গন করব। আবারও আশায় বুক বেঁধেছি। কিন্তু আমারও ভয় লাগছে। যদি আমরা ভুল করি? কী হবে যদি সবার এই শেষ আশাটুকুও আবার ভেঙে যায়? আমরা এতদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। তার ছবির দিকে তাকিয়ে বছরের পর বছর নির্ঘুম রাত কেটেছে, বছরের পর বছর আমাদের খাবার টেবিলে চেয়ার খালি থাকে, বছরের পর বছর দোয়ার উত্তর পাইনি। বছরের পর বছর সে বেঁচে আছে না মারা গেছে তাও জানতে পারিনি।

এতদিন মনে হচ্ছিল আমাদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। আল-আসাদের কারাগার ছিল দুর্ভেদ্য; কংক্রিটের দেয়াল ও কাঁটাতারের আড়ালে বন্দি ছিল। তদন্তকারীরা কারাগারের কাছাকাছিও যেতে পারতেন না, আমাদের মতো স্বজন হারানো পরিবারগুলোকেও কোনো উত্তর দেওয়া হতো না। অথচ বিশ্ব এমনভাবে এগিয়ে চলেছে যেন আমাদের বেদনার অস্তিত্ব নেই এবং আমাদের প্রিয়জনদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এখন আল-আসাদ চলে যাওয়ার পর এবং কারাগারের দরজাগুলো খুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাছে সত্য উন্মোচন করার একটি সুযোগ এসেছে যদি আমরা দ্রুত পদক্ষেপ নিই।

...

এখন যখন সারা দেশের কারাগার এবং আটক কেন্দ্রগুলোর দরজা খোলা হচ্ছে আমরা তখন বিশৃঙ্খলভাবে অনুসন্ধান করছি টুকরো টুকরো তথ্য খুঁজে বেড়াচ্ছি, গুজবের পেছনে ছুটছি এবং ছেঁড়া নথিতে লেখা নামগুলো খুঁজছি। এভাবে আমরা এই মূল্যবান মুহূর্তটিকে আমাদের হাত থেকে ফসকে যেতে দিতে পারি না। এখন পর্যন্ত অনুসন্ধান খুব ধীর, খুব বিশৃঙ্খল, খুব অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো রয়েছে, যারা প্রমাণ সংগ্রহ করার, মানবিক সাহায্য দেওয়ার এবং বন্দিদের তাদের পরিবারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করায় সহায়তা দেওয়ার কথা তারা এই মুহূর্তে তেমন কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। আমাদের প্রয়োজনের সময় তারা অনুপস্থিত।

আল-আসাদের অন্ধকূপ থেকে উঠে আসা প্রতিটি দলিল, প্রমাণের প্রতিটি চিহ্ন এক একজন মানুষের জীবনের অংশ এবং দীর্ঘকাল ধরে যন্ত্রণা ভোগ করা কারও জন্য মুক্তির শেষ সুযোগ। এগুলো একজন বাবার শেষ কথা, একজন ছেলের শেষ অবস্থান, একজন মায়ের ভবিষ্যৎ। আমাদের এই প্রতিটি চিহ্ন, জীবনের এই ছাপগুলো ধরে রাখতে হবে, কারণ সেগুলো হারানো আবার আমাদের প্রিয়জনদের হারানোর শামিল।

...

এখন আমাদের করা দরকার হলো বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়া, প্রমাণ সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং সংরক্ষণ করা এই কাজটি জরুরি এবং যতœ সহকারে করতে হবে, যাতে আমরা এখনই উত্তর খুঁজে পেতে পারি এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও এগুলো ব্যবহার করে ন্যায়বিচার পেতে পারি।

আমরা, গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা, একা একা হারানো বা নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বেড়াতে পারি না। আপনার প্রিয়জন কোথায়, তিনি বেঁচে আছেন না-কি মৃত, এই অনিশ্চয়তার ট্রমা আপনাকে গ্রাস করে ফেলে। আপনার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি শুষে নেয়। আর আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের সত্য উদঘাটন করা শুধুমাত্র আমাদের কাজ নয়। একদিকে আমরা আমাদের ভাই, বাবা, স্বামী, মা এবং বোনদের সন্ধান করছি; অন্যদিকে আমরা পুনর্নির্মাণের উপায়ও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি, পিতামাতাকে হারানো শিশুদের যতœ নেওয়া এবং এই যন্ত্রণা যাতে পরবর্তী প্রজন্মকে গ্রাস না করে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।

ন্যায়বিচার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে আমরা একটু শান্তি পেতে পারি। যারা আমাদের জীবনকে এই দুঃস্বপ্নের মতো করেছে এবং যারা এই দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছে, তাদের জবাবদিহির মধ্যে না আনা গেলে, আমরা শান্তি পাব না।

...

আমার ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর আমাকে সিরিয়া ছাড়তে হয়েছিল। বহু বছর আমি তাকে খুঁজতে যেতেও পারিনি। অবশেষে এখন আমি তাকে খুঁজতে পারছি। ইউসুফের ভিডিও অথবা তার মতো দেখতে একজন মানুষ আমাকে আশাবাদী করেছে এবং কিছু করার একটি আশা দিয়েছে। প্রতিটি সূত্র খুঁজে বের করতে, যে প্রশ্নগুলো আমি বহু বছর ধরে জিজ্ঞাসা করতে চেয়েও করতে পারিনি, সে সবের জবাব পেতে এবং যেসব জায়গা একসময় অপ্রবেশযোগ্য ছিল সেসব জায়গায় যেতে আমি এখন সিরিয়ায় ফিরে যাচ্ছি। সে বেঁচে আছে কি-না তা জানার এটাই হয়তো আমার একমাত্র সুযোগ। অথবা সে হয়তো কোনো কবরে শুয়ে আছে, অবশেষে তাকে সেখানে আমি বিদায় জানাতে পারব। কিন্তু আমরা, নিখোঁজদের পরিবার, একা এই কাজ করতে পারি না এবং এটি আমাদের একা করা উচিতও নয়। আমাদের সাহায্য দরকার, সমর্থন দরকার। এবং আমাদের বিশেষজ্ঞ ও পেশাদারদের নেতৃত্ব প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের নেতৃবৃন্দের অবশ্যই বন্দি এবং তাদের পরিবারকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আমরা দীর্ঘদিন নীরবতার মধ্যে বসবাস করেছি। এখন, আমরা আমাদের প্রাপ্য দাবি করছি : উত্তর, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা।

আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে অনূদিত। ভাষান্তর: মুজাহিদ অনীক

লেখক: আল-আসাদের কারাগারে নিখোঁজের স্বজন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত