বিডার এলএনজি আমদানি ‘চুক্তি’, জানে না পেট্রোবাংলা

  • লুইজিয়ানাভিত্তিক আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে বিডার চুক্তি হয়েছে ওয়াশিংটনে
  • আর্জেন্ট এলএনজি সরবরাহ করতে পারবে ২০৩০ সালের পর
  • যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করেই বাংলাদেশে এলএনজি পাঠাতে পারবে আর্জেন্ট এলএনজি
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:১৫ পিএম

বছরে ৫০ লাখ টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানাভিত্তিক আর্জেন্ট এলএনজির সঙ্গে একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি (হেড অব এগ্রিমেন্ট) সই করেছে বাংলাদেশ। শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে চুক্তিটি সই হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।

গত সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এলএনজি সরবরাহে দেশটির কোনো প্রতিষ্ঠানের এটিই সবচেয়ে বড় ধরনের চুক্তি। অবশ্য নিয়ম অনুযায়ী এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সঙ্গে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন বিষয়টি তারা কিছুই জানেন না। এমনকি চুক্তিটি সই হওয়ার সময় পেট্রোবাংলার কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না সেখানে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত চুক্তিটি করেছে বিডা। তবে বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। বাট ইট ডাজ নট ক্রিয়েট অ্যানি অবলিগেশন (কিন্তু এটি কোনো ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না)। বিষয়টি এমন না যে, এই চুক্তির মাধ্যমে সেখান থেকে এই পরিমাণ এলএনজি পাওয়া যাবে বা সেটা এই মুহূর্তে দেশের গ্যাস সরবরাহ বাড়াবে। এটা এক ধরনের ‘ফ্যাসিলেশন’।’

তিনি বলেন, ‘এখন তারা (আর্জেন্ট এলএনজি) যদি বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করতে চায়, তাহলে যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে। তাদের প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার তা যাচাই-বাছাই করে বিবেচনা করবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে হবে। আগের মতো বিশেষ আইনে প্রতিযোগিতা ছাড়াই এখন আর কিছু করা হবে না। পেট্রোবাংলার সঙ্গে চুক্তি, সরকারের ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনসহ অন্য যেসব প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো ‘ফলো’ করতে হবে।’

বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং যুক্তরাজ্যের পক্ষে আর্জেন্ট এলএনজির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জনাথন ব্যাস ওই চুক্তিতে সই করেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনো সাড়া না মেলেনি।

তবে বিডা এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে। যেখানে নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, ‘এ চুক্তি শুধু বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহই নিশ্চিত করবে না, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত অংশীদারত্বকেও শক্তিশালী করবে। এর ফলে আমেরিকা ফাস্ট এবং বাংলাদেশ ফাস্টের নীতিগুলো ধারণ করে এই সহযোগিতা উভয় দেশের শক্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের কল্যাণকে চালিত করতে সহায়তা করবে।’

এদিকে আশিক চৌধুরী নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার আজকে ট্রাম্পের নতুন এনার্জি এক্সপোর্ট ম্যান্ডেটের ওপর ভিত্তি করে একটা ল্যান্ডমার্ক এগ্রিমেন্ট সাইন করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর আমরাই প্রথম দেশ কোনো ডিল সাইন করলাম। ট্রাম্পের ইলেকশন প্রমিজের মধ্যে ‘ড্রিল, বেবি ড্রিল’— এই স্লোগানটা বেশ পপুলার ছিল। সেটা এই এনার্জি এক্সপোর্টকে ঘিরেই।’

তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে গ্যাসের বিশাল সংকট। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ, কর্মসংস্থান, ইত্যাদির জন্য আমাদের লংটার্ম গ্যাস সাপ্লাই সলিউশন বের করতেই হবে। মিডল ইস্টের বাইরে আমেরিকা একটা ইন্টারেস্টিং অলটারনেটিভ। কিন্তু এই সাইনিংয়ের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসির অ্যাঙ্গেল থেকে। ট্রাম্প সরকারের স্টাইল খুবই ডিফারেন্ট। তারা জাত ব্যবসায়ী। আঁতেল টাইপের কথাবার্তায় নেই। স্ট্রেইট অ্যাকশন দেখতে চায়। লুইজিয়ানার সিনেটর বিল ক্যাসিডি সাইনিং এর কথা শুনে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন! আগামী বছরগুলোতে আমরা যখনই বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাছে যাব, আমরা বলতে পারব যে, বাংলাদেশ কিন্তু তার প্রথম পার্টনার ছিল। তার আমেরিকা ফার্স্টের সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশ ফার্স্ট। আর আমাদের জন্য বাংলাদেশের ইন্টারেস্ট ফার্স্ট! অনেকের কাছে শুনি ট্রাম্প আসার পর নাকি সব শেষ হয়ে যাবে আমাদের। প্রথমত, আমেরিকার ফরেন পলিসি খুব স্টেবল। তারা হঠাৎ ১৮০ ডিগ্রি টার্ন করে না। আর দ্বিতীয়ত, আমরা সৎ হতে পারি, কিন্তু একদম গাধা না।’

এদিকে রয়টার্সের এক খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় এলএনজি সরবরাহ চুক্তি, যা নতুন মার্কিন প্রশাসনের জ্বালানিবান্ধব নীতিকে প্রতিফলিত করছে। কেননা ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন এবং ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি এমন সব নির্বাহী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি না থাকা দেশগুলোতে এলএনজি রপ্তানির লাইসেন্স বিরতি কাটানো যায়।

মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার (ইআইএ) উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এর সক্ষমতা দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। লুইজিয়ানায় বছরে আড়াই কোটি টন এলএনজি সরবরাহের সক্ষমতার একটি অবকাঠামো গড়ে তুলছে আর্জেন্ট এলএনজি। ২০২৯-৩০ সাল থেকে তারা সরবরাহ শুরু করবে বলে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, যদি লুইজিয়ানার বন্দর পোর্ট ফোরশনে আর্জেন্ট এলএনজি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়, তবে এর কার্গোগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেট্রোবাংলার কাছে বিক্রি করা হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত