দ্বৈরথের চাপে অর্থনীতি

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:১০ এএম

শক্তিশালী অর্থনীতিই বিশ্ব কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে। যদিও অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা বলতে কিছু নেই। তবে একটি সরলরৈখিক কাঠামো ধরে রাখা যায়, যদি সেই দেশ অর্থনীতির ব্যাকরণগুলো মেনে চলে। চলতি বছর অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি কমাতে পেরেছে। কিন্তু টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন দূরে রয়েছে। ঋণ পরিশোধের দায় চলতি বছর চিন্তিত করবে অনেক দেশকে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য মানুষের নাভিশ্বাস তুলেছে। মুদ্রাস্ফীতির চিত্র স্বস্তিদায়ক নয়। আবার শ্রীলঙ্কা এর উল্টো। সর্বকালের কম মূল্যস্ফীতিতে পৌঁছেছে দেশটি। ২০২৪ সাল শুরু হয়েছিল যুদ্ধ দিয়ে এবং শেষ হয়েছে যুদ্ধ দিয়েই। এখনো রাশিয়া-ইউক্রেন জ¦লছে। যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর অর্থনীতি, রাজনীতি পরিবর্তিত হয়েছে। গত বছর মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কায় বিশ্বে টানাপড়েন চলছে। সেসব বিবেচনায় এ বছর অর্থনীতি একটি দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে পারে। তবে দ্য মাস্টারকার্ড ইকোনমিকস ইনস্টিটিউট (এমইআই) পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী বছর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে। সে সঙ্গে কমতে পারে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, স্বস্তি আসবে জীবনে। বৃহত্তর বৈশ্বিক অর্থনীতিও একই ধারায় চলবে।

মহামারীর পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেকার হয়েছে অসংখ্য মানুষ। বন্ধ হয়েছে বহু প্রতিষ্ঠান। বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো কৃষিভিত্তিক। দেশের ৭০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক চালিকাশক্তি পোশাকশিল্প। রাজস্ব আয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই আসছে বেসরকারি খাত থেকে। ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী হয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতি শক্তিশালী করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। পোশাকশিল্পের মতো ছোট-বড় কয়েকটি সম্ভাবনাময় শিল্প আশার আলো দেখাচ্ছে। গত বছরের ঘটনার প্রেক্ষাপটে পোশাকশিল্পে অস্থিরতা দেখা দেয়। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। এখনো মার্কিন ডলারের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের অবস্থা খারাপ। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ভালো থাকলেও সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে টেকসই অবস্থা আসেনি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। সরকার এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, তাদের মহার্ঘ ভাতা দেওয়া হবে।

২০২৪ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১ শতাংশ হলেও ২০২৫ সালে তা ৩ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হবে। মাস্টারকার্ডের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যান বলেন, ‘আমরা যদি ২০২৪ সালকে স্বাভাবিকতায় ফেরার বছর হিসেবে ধরি, তাহলে ২০২৫ হচ্ছে স্থিতিশীলতার বছর। আর্থিক নীতিতে শিথিলতা আছে, প্রতিকূলতা কমছে এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে ভোক্তারা উপকৃত হবে।’ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রেমিট্যান্সে গতি এসেছে। ফলে রিজার্ভও আগের থেকে ভালো অবস্থানে ফিরছে। যদিও বাজার মূল্যস্ফীতি চোখ রাঙাচ্ছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে উন্নীত হবে। কিন্তু এর ফলে অনেক রকম বাণিজ্যিক সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন একদিকে যেমন বাংলাদেশের ঋণমান বাড়বে; ঠিক তেমন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তি সংকুচিত হয়ে আসবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের সুদও বাড়বে নিয়ম অনুযায়ী। অনেক বাজারে হয়তো এখনকার মতো সহজ শুল্কমুক্ত সুবিধাও থাকবে না, যদিও ২০২৬ সালের পরের তিন বছর পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাগুলো বহাল রাখার চেষ্টায় আছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমান সময়ের থেকে কিছুটা বেড়ে ৫.৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের এপ্রিল সংস্করণে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে এ বছর থেকে দেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়তে শুরু করবে। একই সঙ্গে কমতে শুরু করবে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতেও অবদান বাড়বে বাংলাদেশের। 

অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মসনদে বসার পর চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে, তা হবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য ভয়াবহ দুঃসময়। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্কবৃদ্ধি, করপোরেট করহার হ্রাসসহ যেসব নির্বাচনী অঙ্গীকার করেছেন, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলো বড় ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে গেলে বৈশ্বিক জিডিপির বড় ধরনের সংকোচন হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

অর্থনীতির এই সংকোচনের পরিমাণ ইউরোপের দুই বড় দেশ ফ্রান্স ও জার্মানির সম্মিলিত জিডিপির সমান হতে পারে। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ ভারত। ২০২৫ সালে এ দেশের জিডিপি জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে, এমন পূর্বাভাস রয়েছে। কিন্তু এফটি বলছে, সম্প্রতি ভারতের প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালে নয়, বরং ২০২৬ সালে ভারতের জিডিপি জাপানকে ছাড়িয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সরবরাহ যুদ্ধ বা অন্য অস্থিরতার কারণে বাধাগ্রস্ত হলে, বিশ্ব জ্বালানি তেল সংকটে পড়তে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি দুর্বল হলেও বিশ্বের ক্ষতি। কারণ বৈশ্বিক জিডিপির একটি বড় অবদান রাখছে মধ্যপ্রাচ্য। লেবাননে ইসরাইলের অভিযান এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন মধ্যপ্রাচ্যকে কোনদিকে নিয়ে যাবে, তা এই মুহূর্তে সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব না। বলা হচ্ছে, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের ফলে ইরান দুর্বল হয়েছে। সেই সঙ্গে রাশিয়ারও তাই। কারণ আসাদ সরকারকে সহায়তা করছিল রাশিয়া। তাকে আশ্রয়ও দিয়েছে দেশটি। অর্থাৎ এখানে পরাশক্তিগুলোর দ্বৈরথ স্পষ্ট। এসব দ্বৈরথের চাপে অর্থনীতি। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে কিছুটা সুখবরের আভাস থাকলেও রয়েছে দুশ্চিন্তাও। এক্ষেত্রে দেশ ভবিষ্যতে অর্থনীতিতে সার্বিকভাবে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। কারণ দেশে বিনিয়োগ না হলে, সেটা দেশি বা বিদেশি, অর্থনীতিতে কোনোভাবেই স্থিতিশীলতা আসবে না। যেভাবেই হোক, অর্থনীতিকে বাঁচাতে হবে। যেতে হবে উন্নয়নের পথে। সম্ভবত এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বিরোধ নেই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত