আফগান নারী ক্রিকেটারদের প্রত্যাবর্তন, একটি ম্যাচ যেন আন্দোলন

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:২৭ পিএম

ক্রিকেট যখন কেবল একটি খেলা নয়, বরং হয়ে ওঠে একটি বার্তা, তখন সেটি সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে যায় নতুন সম্ভাবনার ঠিকানায়। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে জাংশন ওভালে আজকের প্রদর্শনী ম্যাচ ঠিক তেমনই একটি মাইলফলক। এটি শুধুমাত্র আফগান নারী ক্রিকেটারদের জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ম্যাচ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য আফগান নারী ক্রিকেটারদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে তারা নিজেদের প্রতিভা দেখানোর পাশাপাশি নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন।

প্রদর্শনী ম্যাচে আফগান নারী একাদশ আগে ব্যাট করে ২০ ওভারে ১০৩ রান করে ৯ উইকেটে। দলটির পক্ষে সাজিয়া জাজাই সর্বোচ্চ ৪০ রান করেন। ক্রিকেট উইথ বর্ডার্স একাদশের হয়ে অ্যাবে কলিহোল ৪ রান খরচায় সর্বোচ্চ ২ উইকেট শিকার করেন। জবাবে অজি মেয়েরা সেই রান ৪ বল হাতে থাকতেই পেরিয়ে যায়। পায় ৭ উইকেটের জয়।

হেরে গেলেও মাঠে ফিরতে পেরে খুশি আফগান নারী ক্রিকেটাররা। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটির নারী ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যায়। দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই ক্রিকেটাররা পেশাদার পর্যায়ে খেলার স্বপ্ন নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেছেন অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্ন এবং ক্যানবেরায় বিভক্ত হওয়ার পর এই ম্যাচই তাদের প্রথমবার একসঙ্গে মাঠে নামার সুযোগ। তাই এটি কেবলমাত্র একটি ম্যাচ নয়, বরং তাদের অস্তিত্বের পুনরুদ্ধার।

ফিরোজা আমিরি যিনি একসময় আফগানিস্তানের জাতীয় নারী দলের অন্যতম ভরসা ছিলেন। খেলতে নামার আগে তিনি বলছিলেন, ‘এই ম্যাচ আমাদের জন্য শুধু ক্রিকেট নয়, এটি আমাদের অধিকার এবং পরিচয়ের প্রতীক।’

ম্যাচটির জন্য গত কয়েক মাস ধরে দুটি ভিন্ন শহরে অনুশীলন করছিলেন ক্রিকেটাররা। ক্যানবেরায় থাকা দলের প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরি দলের চেলসি মস্ক্রিপ্ট। তিনি বলেন, ‘যখন এই ম্যাচ ঘোষণা হলো, তখন থেকেই মেয়েদের উচ্ছ্বাস কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তাদের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের ঝলক স্পষ্ট।’

ব্যাট হাতে খুশি আফগান নারী ক্রিকেটাররা।

মস্ক্রিপ্টের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ভাষার বাধা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ অধিকাংশ আফগান ক্রিকেটার ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। তবে জাপানে কাজ করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সহজবোধ্য ভাষা ও শরীরী ভাষার মাধ্যমে তাদের শেখানোর নতুন কৌশল খুঁজে বের করেন।

ক্যানবেরার বেনাফশা হাশিমি বলেন, ‘আমরা আলাদা আলাদা ক্লাবে খেললেও, একসঙ্গে অনুশীলনের দিনটি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের। আমরা একে অপরের ভুল শুধরে দেই, নতুন কিছু শিখি।’

মেলবোর্নের দলেও ছিল একই উচ্ছ্বাস। আমিরি ড্যান্ডেনং ক্লাবে খেলেন, আর নাহিদা সাপান কার্নেগি ক্লাবে। কিন্তু জাতীয় দলের জন্য তারা যেন সবসময়ই একত্র। এই ম্যাচের গুরুত্ব বোঝাতে সাপান বলেন, ‘আমরা চাই, এই ম্যাচটি আমাদের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করুক।’

এই ম্যাচটি শুধুমাত্র একটি প্রদর্শনী ম্যাচ হলেও, আফগান নারী ক্রিকেটারদের জন্য এটি বড় কিছু অর্জনের প্রথম ধাপ হতে পারে। তাদের আশা, এটি নিয়মিত খেলার জন্য নতুন পথ তৈরি করবে। হাশিমি বলেন, ‘আমরা চাই, এটি আমাদের শেষ ম্যাচ না হয়। আমরা আরও অনেক ম্যাচ খেলতে চাই, নিজেদের প্রতিভা দেখাতে চাই। এই ম্যাচ শুধুই একটি খেলা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের দরজা খুলতে পারে।’

ক্রিকেট যে শুধুই একটি খেলা নয়, তা প্রমাণ করে দিচ্ছেন এই আফগান নারীরা। তারা জানেন, এই ম্যাচ তাদের ক্রীড়াজীবনের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই এটি আফগান নারীদের অধিকারের জন্য একটি প্রতীক। সাপান বলেন, ‘আমরা শুধু একটি দল গড়ে তুলছি না, আমরা পরিবর্তনের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তুলছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত