পুরনো বিতর্কে লাগতে পারে নতুন হাওয়া

  • স্বতন্ত্র প্রার্থিতায় ৫০০ ভোটারের সম্মতি
  • এ ধরনের বিধান সংবিধান পরিপন্থী: সাবেক ইসি রফিকুল
  • স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর বৈষম্যমূলক: ড. শামছুল আলম
  • এমন বিধান সমর্থনযোগ্য নয় মনে করেন রাজনীতিকদের অনেকে
আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:৪৯ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন এরই মধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছে। যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারের স্বাক্ষর ১ শতাংশ বাদ দিয়ে ৫০০ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে কমিশনের এমন প্রস্তাবের বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এ ধরনের বিধান সঠিক নয়। এ বিধানের মাধ্যমে অতীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের বিপাকে ফেলা হয়েছে। একইভাবে আগামীতেও বিধানটির সুযোগ নেওয়া হতে পারে।

তাদের মতে, ১ শতাংশ বা ৫০০ ভোটারের স্বাক্ষর হোক বিষয়টি একই রকম। এ পদ্ধতি বাতিল না হলে পুরনো বিতর্কের পালে ফের নতুন করে হাওয়া লাগতে পারে।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান প্রচলন হয়। ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এ বিধান প্রচলন করে। বিদ্যমান গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে প্রার্থীকে ওই আসনের মোট ভোটারের এক শতাংশের সমর্থনের তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। যারা সমর্থন করবেন, সেই তালিকায় তাদের স্বাক্ষর বা টিপসই থাকতে হবে। তবে আগে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে থাকলে বা দলীয় প্রার্থী হলে এমন তালিকা জমা দিতে হবে না।

এমন বিধান তৈরির সময় কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রার্থিতার শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এমনটি করা হচ্ছে। ঢালাওভাবে যেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সেজন্য এমন আইন করা হয়।

অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করে। যার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও রয়েছে। গত ১৫ জানুয়ারি এ কমিশন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারে ১৫০টি প্রাথমিক সুপারিশ করে।

কমিশনের প্রতিবেদনে প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা অংশের ‘ঝ’ পয়েন্টে বলা হয়েছে, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধানের পরিবর্তে ৫০০ ভোটারের সম্মতি ক্ষেত্রে একক কিংবা যৌথ হলফনামার মাধ্যমে ভোটারদের সম্মতি জ্ঞাপনের বিধান করা।’

সংস্কার কমিশন ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের পরিবর্তে ৫০০ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর নেওয়ার সুপারিশ করেছে। বাকি যেসব নিয়ম রয়েছে তা অক্ষুণ্ণ থাকবে।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার (ইসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের বিধান সংবিধান পরিপন্থী। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের রাজনীতি তো আমেরিকার রাজনীতির মতো নয়। ফলে এ ধরনের বিধান যেমন প্রার্থীর জন্য বিপজ্জনক তেমনি যিনি স্বাক্ষর দেবেন তার জন্যও বিপজ্জনক। আমাদের সময় এটা বাতিলের জন্য চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা করা যায়নি।’

সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, ‘বিষয়টা যেহেতু সাংবিধানিকও নয়, আবার প্রার্থীর জন্য সুখকরও নয়; ফলে অনেককেই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। আমি মনে করি অসাংবিধানিক জিনিস যখন প্রয়োগ করতে যাবে তখন এগুলো ভালো রেজাল্ট (ফল) বয়ে আনে না।’


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেড়শর বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ১০৪ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাকিরা স্বাক্ষর জটিলতায় নির্বাচনী দৌড় থেকে বাদ পড়ে যান। এরপর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৪৯৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। যদিও তাদের মধ্যে শেষমেশ মাত্র ১২৮ জন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। একই ধরনের চিত্র ছিল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। ওই নির্বাচনে ৭৭৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ পেয়েছিলেন ৪৩৬ জন। বেশিরভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থী স্বাক্ষর জটিলতায় বাদ পড়েন। তখন প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় অনেককেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর তদন্ত করতে গিয়ে সত্যিকারভাবে যাচাই-বাছাই না করেই প্রাথমিকভাবে তাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বামজোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন অনেক কিছু সুপারিশ করেছে। অনেক বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। সেটা আমরা যথাসময়ে বলব। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারের স্বাক্ষর ৫০০ করার যে সুপারিশ নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন করেছে, সেটা আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখবে।’

বামজোটের এ নেতা বলেন, ‘ভোট একটা গোপন বিষয়। সুতরাং এটাকে উন্মুক্ত করার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান বৈষম্যমূলক বলে মনে করি। সুতরাং এটার সঙ্গে আমরা একমত নই।’

একই ধরনের মন্তব্য করেন গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘ভোট তো একটা গোপন ব্যাপার। সেটা আগে তাকে পাবলিক (প্রকাশ্য) করতে হবে কেন? নীতিগতভাবে এটা সমর্থনযোগ্য না। যে যুক্তিতে আমরা এক শতাংশের বিরোধিতা করেছি, একই যুক্তিতে আমি মনে করি এটাও (৫০০ ভোটারের স্বাক্ষর) যুক্তিযুক্ত না। হয়তো এটা আগের থেকে একটু সহজতর করেছে এটা সত্য। এটা করার কারণটা মনে হয় চাইলেই যে কেউ যাতে প্রার্থী হয়ে যেতে না পারে। এর পক্ষে হয়তো এটা যুক্তি। আমরা আরেকটু দেখব, তারপর আমরা আমাদের পর্যালোচনা তুলে ধরব।’

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারের স্বাক্ষরের মতো বিধান নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করেন ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ইউনূস। তিনি বলেন, ‘একজন প্রার্থী ভোটে দাঁড়াবে। আগেই সেই প্রার্থীকে কে কে ভোট দেবে সেটা প্রকাশ্যে আসাটা ঠিক হবে না। এতে করে বিতর্কের জন্ম দেবে, অনেকে কোণঠাসা হয়ে পড়বে, এটা ঠিক হবে না। নাম-ঠিকানা যদি দিতে হয় দেখা যাবে তারা কোনো এক মহল থেকে চাপের সম্মুখীন হবে। তাতে নির্বাচন একটা বিতর্কের মধ্যে পড়তে পারে।’

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারের স্বাক্ষরের মতো বিধান বৈষম্যমূলক বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. শামছুল আলম সেলিম। তিনি বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর এক ধরনের বৈষম্য। অতীতেও এ ধরনের বিধান ছিল।

তাতে দেখা গেছে, প্রার্থীদের নানা ধরনের ভোগান্তি হয়েছে। একজন প্রার্থীর পক্ষে যদি ৫০০ লোক স্বাক্ষর দেয় তখন এটা আগেই প্রকাশ হয়ে যাবে কে কে তাকে সমর্থন করছে। তখন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, ‘প্রার্থিতা উন্মুক্ত থাকুক। কারও যদি যোগ্যতা থাকে তাহলে সে নির্বাচন করবে। এটা ওপেন থাকা ভালো। স্বাক্ষর নেওয়ার তো দরকার নেই। গণতন্ত্রের রীতিনীতি অনুযায়ী দেশের যেকোনো বৈধ নাগরিক এবং সুস্থ মানুষ নির্বাচন করার অধিকার রাখেন। পৃথিবীর কোথাও এ ধরনের নিয়ম আছে বলে আমারা জানা নেই। আমাদের দেশে কেন করতে হবে। আমার দৃষ্টিতে এটা যথাযথ নয়। এ ধরনের প্রস্তাবনাগুলো আরও বিবেচনা করা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত