১৩ বছরে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক ১২ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই খেলাপি ঋণের কারণে দেশের আর্থিক খাত বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে অর্থনীতিতে কী অর্জন এবং সামনে কী চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, তার ওপর রবিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা সভা হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিভিন্ন খাতে সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে ওই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর প্রমুখ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের জুন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। বিগত সরকারের আমলে আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে অন্তত ১০টি ব্যাংক তীব্র ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
দেশের আর্থিক খাতের সংকট উত্তরণে টাস্কফোর্স গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
অধিক করণীয় হিসেবে দ্রুত ‘অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ’ করে ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা যাচাই, ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনে একটি ব্যাংকের সঙ্গে অন্য ব্যাংকের একীভূত করা, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিপ্রণয়ন এবং দেশের অর্থ পাচারকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক তৎপরতা জোরদারের পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য আর্থিক দুর্বলতা এবং বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ স্বল্প মেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ বিবেচনায় মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ঘনীভ‚ত হওয়ার আগেই শ্রমিক অসন্তোষ প্রশমিত করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
মূল্যস্ফীতি
দেশের মূল্যস্ফীতির গতিধারা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। জানুয়ারিতে কিছুটা কমে তা ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। জানুয়ারিতে তা হ্রাস পেয়ে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান আমদানির উৎস দেশ চীন এবং ভারতে মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের কম এবং বর্তমানে টাকার বিনিময় হার কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে, আমদানিজনিত কারণে মূল্যস্ফীতির সম্ভাবনা কম। মূলত, সরবরাহ চেইনের দুর্বলতার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং সহায়ক রাজস্বনীতি গ্রহণ করেছে সরকার। গত বছরের জুলাই মাসে সুদের হার ছিল ৮ শতাংশ। ধাপে ধাপে তা বৃদ্ধি করে ডিসেম্বরে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে এবং এর ফলে নীতি সুদহারের করিডরের ঊর্ধ্বসীমা ১১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার নতুন করে টাকা ছাপানো বন্ধ রেখেছে। এ ছাড়া কম গুরুত্বপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্প বাতিলসহ সরকারি খরচ হ্রাসে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া চাল, আলু, পেঁয়াজ, ভোজ্য তেল ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর শুল্ক অব্যাহতি/হ্রাস করা হয়েছে। দেশের এক কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সুলভমূল্যে পণ্য সরবরাহের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ট্রাকের মাধ্যমে বিভাগীয় শহরগুলোয় তেল, চিনি, ডাল ও রমজান উপলক্ষে খেজুর এবং ছোলা সুলভমূল্যে সরবরাহ করা হবে।
অন্যান্য পদক্ষেপ হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে প্রতিটি জেলায় ১০ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পরও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিদ্যমান ত্রুটির ফলে এই প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি নিরসনে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। কিছু সাময়িক পদক্ষেপের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা সম্ভব।
এসব পদক্ষেপ হলো— পণ্য সরবরাহ চেইনের সর্বস্তরের প্রতিবন্ধকতা কঠোরভাবে প্রতিহত করা, হিমাগারসহ সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (চাল, পেঁয়াজ, তেল, আলু ইত্যাদি) গুদাম নিবিড় পরিবীক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা, অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে প্রতিযোগিতা কমিশনকে শক্তিশালী করা। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে জেলা ও উপজেলাপর্যায়ে এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সার, বীজ ও পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে।
খাদ্য নিরাপত্তা
মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে চলতি অর্থবছরে আরও ৯ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ ছাড়া ইউরিয়া সারের বাফার স্টক প্রায় আট লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। সারের মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে ভর্তুকি প্রদান অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ বাবদ ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ৮ হাজার ৫৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মূলত ওএমএস, টিসিবি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারা বছর চলমান রাখার লক্ষ্যে বর্ধিত হারে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে অধিকতর করণীয় হিসেবে সরকারের উদ্যোগগুলো হলো— কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকৃত চাষিদের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, মাঠপর্যায়ে উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর পদ্ধতি দ্রুত খুঁজে বের করে চাষিদের জন্য একটি ব্যবসা মডেল তৈরি করার বিষয়টি বিবেচনা করা।
চাল, ডাল, তেল, আলু ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের বার্ষিক চাহিদার সঙ্গে বর্তমান মজুদের তুলনাভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে মধ্যমেয়াদি চাহিদার প্রক্ষেপণ এবং এসব পণ্য সরবরাহের রূপরেখা তৈরি করা। চাল, আলু, পেঁয়াজসহ কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সাময়িক ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক শুল্ক হ্রাস/অব্যাহতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। খাদ্যদ্রব্যের পাশাপাশি সার ও কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য উপকরণ সরবরাহের রূপরেখাও তৈরি করা এবং কৃষি ও খাদ্যদ্রব্য মজুদ/সংরক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুদাম/হিমাগারের সংখ্যা বৃদ্ধির কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত
বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে সংশোধিত বাজেটে ৬২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করেছে সরকার।
গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি না করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার মাধ্যমে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের কথা জানিয়ে সরকার বলছে, এতে চলতি অর্থবছরে ১১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা সাশ্রয় (প্রায় ১০% ব্যয় হ্রাস) করা সম্ভব হবে।
উৎপাদনব্যয় যৌক্তিকপর্যায়ে কমিয়ে আনার জন্য এর আগে সম্পাদিত চুক্তিতে বিদ্যুতের ক্রয়মূল্য পুনর্বিবেচনা করার উদ্যোগ এবং এনার্জি অডিট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।
এদিকে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন ক‚প খননের মাধ্যমে দৈনিক ৬৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৮ সালের মধ্যে তা বৃদ্ধি করে ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নতুন রিগ কেনাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিদ্যমান থাকায় বর্তমানে বিদ্যুৎ এবং সারের ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হলে ভর্তুকি হ্রাসের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে মূল্য সমন্বয় করার কথা বিবেচনা করবে বিদ্যুৎ বিভাগ।
অধিকতর করণীয় হিসেবে গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি সম্পাদনের জন্য আবার বিডিং রাউন্ড পরিচালনা করা, বিদ্যুতের উৎস হিসেবে তেলভিত্তিক জ্বালানির পরিবর্তে গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, জ্বালানি তেলের সংরক্ষণ ও পরিশোধনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বৈদ্যুতিক গাড়ি ও যন্ত্র ব্যবহার উৎসাহিত করার কথা বলছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়।
