কার মুখ কে আটকায়! তা সম্ভবও নয়। ৫ আগস্টের ঘটনাবলি আরও অনেক কিছুর সঙ্গে মানুষের মুখ খুলে দিয়েছে। মনমতো কথা ফোটানোর একটা চর্চা চলছে। যার যেটা মনে হয়, বলে দিচ্ছেন। বলাবলি শুরু হয়েছে, ড. ইউনূস কুলাচ্ছেন না। উপদেষ্টারাও নাকি ঠিকমতো পারছেন না। এর বিপরীত মতও আছে। অনেকে বলছেন, এখনই চলে গেলে কাকে বসাবেন? বরং প্রেশার দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে হবে। প্রেশারটা বুঝতে শুরু করেছেন, উপদেষ্টাদের কেউ কেউ। যথাসময়ে যথাকাজ করতে না পারার কথা স্বীকার করতেও শুরু করেছেন। বাড়তি চাপ অনুভবের কথা জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে, আর্থিক যেসব ক্ষতি হয়েছে সেগুলো পুষিয়ে নিয়ে দেশের অর্থনীতিকে মোটামুটি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। এ উপলব্ধির কথাও জানিয়েছেন, কিছু কিছু কাজ বাইরে থেকে বলা যত সহজ ভেতর থেকে বুঝা যায় একটা সমস্যার সমাধান করতে গেলে আরেকটা সমস্যা সামনে এসে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই সরলীকরণ করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।
এ সরকার রাজনৈতিক সরকারের মতো ক্যাপাবল নয়, তাও উপলব্ধি হয়েছে তার। গণমাধ্যমের কাছে এতদিন পর এ বোধের কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সরকারের নিজস্ব লোক আছে, কর্মী আছে। স্থানীয় পর্যায়ে তারা রাজনীতি করে এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বাড়তি আয় পায়। কিন্তু আমরা তো সরকারের কর্মচারী।’ নতুন কিছু কথা যোগ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলমও। আশ্বাস দিয়েছেন মূল্যস্ফীতি কমে যাবে বলে। সরকারের কিছু পদক্ষেপ উল্লেখ করে কথা দিয়েছেন, জুলাই নাগাদ মূল্যস্ফীতি নেমে আসবে ৭ দশমিক পাঁচ শতাংশে। বাস্তবে কতটা কী হবে সেটা অপেক্ষার বিষয়। অন্তত ত্রুটি স্বীকার ও ভালো কিছু করার বোধ যে এসেছে তাও কম কি! মন্দের ভালো। বাংলাদেশ ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, কানাডা হয়ে গেছে বলে বসলে কী করার থাকত আমাদের? সময়টা খারাপ। সামনে রমজান। আলু, শিম, কপি, টমেটোসহ মৌসুমি সবজি ছাড়া বাজারে আর প্রায় সব পণ্যেরই দাম চড়া। চালের দাম আকাশছোঁয়া। চিকন চালের দাম গত এক মাসে কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। মিনিকেট-নাজিরশাইলের মতো চিকন চাল কিনতে কেজিতে গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। বেড়েছে মোটা ও মাঝারি চালের দামও। এমন সময়ে চালের দাম বাড়ল, যখন আমনের ভরা মৌসুম। সাধারণত খরা মৌসুমে চালের দাম বাড়ে আর ভরা মৌসুমে কমে। এবার হয়েছে তার বিপরীত। খুচরা ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়ার জন্য মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের দায়ী করেন। বড় ব্যবসায়ীরা বাজারে যখন দাম কম থাকে, চাল কিনে মজুদ করেন, আর যখন বাড়তি থাকে, তখন বিক্রি করেন। বাজারে চালের অভাব নেই। কিন্তু ব্যবসায়ীরা নানা কারসাজি করে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
অতীতে দাম বাড়ানোর জন্য যে সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, তারা এখনো আছে। কিন্তু গত পাঁচ-ছয় মাসেও সরকার বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বা নিতে পারেনি। বাজারে অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লে, মানুষ কম কিনে ব্যয় কমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু চালের ক্ষেত্রে তত সম্ভব নয়। গরিবদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করতে হয় চালের পেছনে। সয়াবিন তেলের দামও বাড়বাড়ন্ত। সাফল্যের সঙ্গে সংকট জিইয়ে রাখছে সংশ্লিষ্টরা। দাম বাড়ানোর এক মাসের মাথায়ও বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক করেনি কোম্পানিগুলো। পাড়া-মহল্লার বেশিরভাগ দোকানে সয়াবিন তেল ‘নাই’ করে ফেলা হয়েছে। গত ৯ ডিসেম্বর সরকার তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায়। প্রতি লিটার খোলা ও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম আট টাকা বাড়িয়ে দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম হয়েছে ১৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৫৭ টাকা। এরপরও বাজারে হাহাকার। খুচরা ব্যবসায়ীরা অগ্রিম টাকা দিয়েও সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না। তেলের সঙ্গে অন্যান্য পণ্য না কিনলে তেল দেয় না কোম্পানিগুলো। পুরোটাই কারসাজি। রমজানকে বাড়তি কামাইয়ের টার্গেট করেই কারসাজি। তা জায়েজ করতে অন্তহীন অজুহাত। নানা অজুহাতে একের পর এক বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর যত আয়োজন। টানা মাস কয়েক পেঁয়াজ-আলুর পর এখন তাদের চোখ চাল-তেলে। রমজান সামনে রেখে এ তালিকায় যোগ করেছে মসলাকে। গত দেড় মাস ধরে দফায় দফায় দাম বেড়েছে রান্নায় অতিপ্রয়োজনীয় এ পণ্যের। খুচরায় কোনো কোনো মসলার দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। এর মধ্যে এলাচের দাম বাড়ার গতি অস্বাভাবিক। গত দেড় মাসে মানভেদে এলাচের দাম কেজিতে বেড়েছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। কালোজিরা, গোলমরিচের দামও চড়িয়েছে। দেশে মসলার চাহিদার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। এখানে শুল্ক-কর, বিশ্ববাজার, ডলারের দামের বিষয়-আশয় রয়েছে। এলাচ আমদানি করতে হয় গুয়েতেমালা ও ভারত থেকে। চলতি বছর দেশ দুটিতে এলাচের উৎপাদন কম হওয়ায় বিশ্ববাজারে দাম একটু বেড়েছে সত্য। মুনাফালোভী চক্র একে নিয়েছে চান্স হিসেবে। খুচরা পর্যায়ে মান ও আকারভেদে প্রতিকেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকায়। মাসখানেক আগেও এ ধরনের এলাচের কেজি ছিল ৩২০০ থেকে ৩৮০০ টাকা। দামের কারসাজিতে কুশীলবরা ছাড় দিচ্ছে না কোনো পণ্যেই। যখন যেটাকে পারছে ধরছে। তাদের চালবাজির এখনকার হট আইটেম চাল। তা মিল গেট থেকে একদম আড়ত পর্যন্ত। মিলগেটে দাম বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের চালের দামই এখন চড়া। গত এক থেকে দেড় মাসের ব্যবধানে রাজধানীর আড়তগুলোয় সরু চালের ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, মাঝারি চালের বস্তায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। মোটা চালের বস্তায়ও একই হারে বেড়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত আমদানি নিষিদ্ধ থাকলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও চালের দরে স্বস্তি ফিরছে না। ব্যবসায়ীদের অজুহাত আন্তর্জাতিক বাজার ও ডলারের দিকে। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির তথ্য ভিন্ন। তারা বলছে, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রতিকেজি সরু চালে প্রায় ৫ শতাংশ, মাঝারি চালে ৫ শতাংশ এবং মোটা চালে ৬.৬৭ শতাংশ দাম বেড়েছে। কিন্তু, বাস্তবটা তা নয়।
বরাবরই রমজান মাস ঘনিয়ে এলে, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। বিষয়টি অনেকটা রীতিতে পরিণত হয়েছে। এবার অসাধু ব্যবসায়ীদের রোজার কারবারের নমুনা বেশি খারাপ। এ সময়ে যেসব পণ্যের দাম কমে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে, সেগুলোর দামও ফের বাড়ানো হয়েছে। ছোলা, খেজুর থেকে শুরু করে মাংস, ডিম, এমনকি চিঁড়া-মুড়িও এ সময়ে মুনাফার এক একটা বিশাল আইটেম। শুধু আমদানিকৃত নয়, দেশে উৎপাদিত পণ্য নিয়েও এ কারবারিদের অনেক আয়োজন। অভিযান, জরিমানা বা বিচার-সালিশে তা একটু আধটু দমন সম্ভব। প্রতিরোধ অসম্ভব। কারণ এখানে নৈতিকতার বালাই নেই। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত মুনাফা হাতানোই মূল কথা। সেই বিবেচনায় রোজা-রমজান একটা মৌসুমি চান্স। রোজায় বিক্রি কয়েকগুণ বাড়লে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যবসায়ীরা দাম কমান। এখানে উল্টো। যে যেভাবে পারে বাড়তি মুনাফা হাতায়। যে কোনো অজুহাতে অল্প সময়ে অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। যার চড়া মাশুল দিতে হয় ভোক্তাকে। তার ওপর সয়াবিনসহ ভোজ্য তেল নিয়ে শুরু হয়েছে নয়া কারসাজি। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমছে। ভোজ্য তেল পরিশোধনকরী দেশীয় কারখানাগুলোর মালিকরাও সরকারকে জানিয়েছেন, অন্যবারের তুলনায় এ বছর আমদানি পরিস্থিতি ভালো। অথচ বোতলজাত ভোজ্য তেলের সংকট চলছে। পরিশোধন কারখানার মালিকরা অন্য পণ্য কেনার শর্তে ভোজ্য তেল বিক্রি করছেন। কেন এই চাতুরী? সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিটিটিসি জানায়, বাজারে ভোজ্য তেলের কোনো ঘাটতি নেই। যেটি হয়েছে তা কৃত্রিম সংকট এবং প্রকৃত তথ্যের ঘাটতি থেকে তা সৃষ্ট। কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভোজ্য তেলের আমদানি প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। এলসি বেড়েছে একই হারে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় ভোজ্য তেলের উৎপাদন ও বিপণনের সব পর্যায়ে বাজার তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। অনেক দিন ধরেই ভোজ্য তেল নিয়ে সমস্যা চলছে। কিন্তু বাজার তদারকিতে তা ধরা পড়ে না। পড়লেও সেটি চেপে যাওয়া হয়।
বাজারসহ অর্থনৈতিক বিষয়ে শ্রীলঙ্কা আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শ্রীলঙ্কার অন্তর্বর্তী সরকারের পেছনে মূল শক্তি ছিল দেশটির সেনাবাহিনী। তারাসহ সব রাজনৈতিক দল বিক্রমাসিংহের অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। এর সাফল্য হিসেবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৭৪ শতাংশ থেকে কমে -৫ শতাংশে নেমে আসার ম্যাজিক সাধন হয়েছে। ফলে শেয়ারবাজার স্থিতিশীল হয়, সূচকের দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়। বৈদেশিক ঋণের অনেকটা শোধ করে দেয়। শুরু থেকে আমাদের দেশে এর বিপরীত চিত্র। এখানেও কিছু বোধের বিষয় আছে সরকারের জন্য।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
[email protected]
