ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে ১২-১৩ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন। গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর মোদি এই প্রথম সে দেশটিতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক সফরে সে দেশে আছেন এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইসিবা চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন।
ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী দেশটির অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে উগ্র ডানপন্থি নীতি বাস্তবায়িত হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ট্রাম্প গাজা বিষয়ে নেতানিয়াহুর সুরে কথা বলেছেন, আক্রমণের শিকার গাজাবাসীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তুলে দেওয়া, পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, এমনকি কানাডা দখলের আলাপও করেছেন। ট্রাম্পের বিগত মেয়াদে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ চরমে উঠেছিল। আবার ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প সেই যুদ্ধ আবারও শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে মোদির এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে শত্রুতা এই দুই দেশকে কতোটা কাছে আনে তা দেখার বিষয়। দুই নেতাই লোকরঞ্জনবাদী এবং চীনের বিরুদ্ধে শত্রুতা তাদের রাজনীতির বড় হাতিয়ার। তবে, ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও মাঝে মাঝে সম্পর্কের টানাপড়েন চলে। ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত রাশিয়ার পক্ষে ঝুঁকে ছিল এবং এর মাধ্যমে তারা রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনতে পেরেছে। ট্রাম্পের অভিবাসী নীতির ফলে ভারত হুমকির মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয়রা বিপুল সংখ্যায় বাস করে। আইটিসহ নানা রকম ক্ষেত্রে ভারতীয়রা শীর্ষ অবস্থানে আছেন। অনাবাসী ভারতীয়রা সে দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, ট্রাম্পের আগ্রাসী অভিবাসী-নীতি কীভাবে ভারত মোকাবিলা করে, তা দেখার বিষয়। মোদি এমন সময়ে ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন যার কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ ভারতীয় নাগরিককে সামরিক বিমানে করে পাঞ্জাবে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। এই নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছিল অথবা তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুসারে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৭,২৫,০০০ অবৈধ ভারতীয় বসবাস করে।
অবশ্য হোয়াইট হাউজের বরাতে জানা গেছে যে, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ও মোদি একটি ‘প্রোডাক্টিভ’ ফোন কল করেছেন যেখানে দুই নেতা অবৈধ অভিবাসী, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছেন। গত বছর ট্রাম্প মোদিকে ‘মহান নেতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, তবে তিনি একই সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য শুল্ককে অতিরিক্ত আখ্যা দিয়ে এর সমালোচনা করেছিলেন। গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধমানভাবে ভারতকে চীনের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাবের প্রতি ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে দেখছে। এক বিবৃতিতে, প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ‘এই সফরটি হবে তার [ট্রাম্পের] প্রথম মেয়াদে আমাদের সহযোগিতার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলার একটি সুযোগ।’ তিনি যোগ করেছেন প্রযুক্তি, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, শক্তি এবং সরবরাহ চেইন স্থিতিস্থাপকতা এমন ক্ষেত্র যেখানে অংশীদারত্বকে উন্নত এবং গভীর করা যেতে পারে। কর্মকর্তারা বলেছিলেন যে, ভারত প্রাথমিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে উৎসারিত বা কেনার জন্য আরও সম্ভাব্য পণ্য যেমন ডিশ অ্যান্টেনা এবং কাঠের সজ্জার মতো আইটেমগুলোতে ছাড় বিবেচনা করা হচ্ছে।
দ্বিমুখী বাণিজ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যার ফলে উদ্ধৃত ৩২ বিলিয়নে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি ট্রাম্পের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে এবং ভারত একটি সম্ভাব্য ক্ষুদ্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য উন্মুক্ত বলে দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মোদির প্রাথমিক সফরের লক্ষ্য ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে ঘটছে এমন একটি বাণিজ্য যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি এড়ানো। ভারত ইদানীং এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যা ট্রাম্পের সহানুভূতি আদায়ে সুবিধা করে দিতে পারে। শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা ভারতের বাজেটে উচ্চ-সম্পদ বাইক এবং বিলাসবহুল গাড়ির ওপর কর কমানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি আইটেমের ওপর গড় আমদানি শুল্কের হার ১৩ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ভারত বিলাসবহুল গাড়ি এবং সোলার সেল-সহ ৩০টিরও বেশি আইটেমের ওপর সারচার্জ পর্যালোচনা করছে।
ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনার খবর প্রচারিত হওয়ার পরে ধাতব স্টকগুলোর শেয়ারের দরপতন হয়েছে। একটি শিল্প সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মি. ট্রাম্প যদি প্রস্তাবিত ২৫ শতাংশ শুল্ক গ্রহণ করেন তবে দেশের প্রকৌশল সামগ্রীর প্রায় পঞ্চমাংশ ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম সমন্বিত এবং প্রায় ২৫ বিলিয়ন মূল্যের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মোদির এই সফর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে গোটা বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি সামনের দিন প্রভাবিত করতে পারে।
ট্রাম্প নতুনভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরে সমর্থকদের কাছে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং ক্ষমতা সুসংহত করতে আরও বেশি আগ্রাসী হবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, টানা তিনবার নির্বাচিত হলেও শেষবার মোদি ম্যাজিক কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ফলে, তিনিও আগ্রাসী ভূমিকা নেবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে দুই নেতাই দুই পরাশক্তির সম্পর্ক আর জোরালো করে নিজেদের কৃতিত্ব নিতে চাইবেন। বাংলাদেশের জন্যও এই আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আগস্টের পাঁচ তারিখের পর পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসা কমিয়ে দেওয়া ও সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে অগণিত ভুয়া খবর প্রচার করে দেশটি বৈরী ভূমিকা নিয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে আলাপে মোদি এই বিষয়টি উত্থাপন করেন কি না, তা দেখার বিষয়। ফলে, গোটা দুনিয়ার মতো বাংলাদেশও এই শীর্ষ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও অনুবাদক
