অনিরাপদ জনজীবন

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫, ১২:৪৩ এএম

নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করছে জনজীবন। বাংলাদেশের সর্বত্র এই দৃশ্য! ডাকাতি,  চোরাচালান ও অপহরণ বাড়ছে। হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ নিয়মিত চলছে দেশব্যাপী। দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতিই কি তা প্রকট করেছে? দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি জানাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপারে স্বাধীনতার ৫৩ বছরে আমার মনে হয়  কোনো মিডিয়ায় এমন লেখেনি, এ বছর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। এ রকম কিন্তু কোনো সংবাদ মনে হয় কোনো সাংবাদিক...যেহেতু আমি নিজেও একসময় সাংবাদিকতা করেছি, আমি মর্নিং নিউজে ছিলাম, আমরাও কোনোদিন করিনি। কিন্তু এখনো যে পরিস্থিতি, আগের মতোই অবস্থা। আমি বলব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্যাটিসফ্যাকটরি (সন্তোষজনক)। কিন্তু এটার উন্নতি করার অবকাশ রয়ে গেছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই, গণপরিবহনে ডাকাতি, হামলা, ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঘটনায় পুরো  দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতির উন্নতিতে চলছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ তিনটি অভিযান। যার মধ্যে রয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাঁড়াশি অভিযান এবং যৌথবাহিনীর অভিযান। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকারের এমন প্রচেষ্টাতেও থেমে নেই ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধ। সাধারণ মানুষের পিটুনিতে ছিনতাইকারী ও ডাকাত দলের সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।

শরীয়তপুরে ডাকাতি, দূরপাল্লার যানবাহনে গণহারে ডাকাতি এবং পটুয়াখালীর দুমকিতে নারী পোশাককর্মী এবং নীলফামারীর ডিমলায় স্কুলছাত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও রাজধানী ঢাকায় আইনজীবীসহ অস্বাভাবিক মৃত্যু হওয়া চারজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। পাবনার সাঁথিয়ায় মধ্যরাতে সড়কে গাছ ফেলে মাইক্রোবাস, ট্রাকসহ বেশ কয়েকটি যানবাহনে ডাকাতি, চট্টগ্রাম নগরে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার এক পুলিশ সদস্য, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফালগুনকরা এলাকায় প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতি, ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ম্যাগপাই নিটওয়্যার লিমিটেড নামে একটি বন্ধ পোশাক কারখানায় নিরাপত্তা প্রহরীদের মারধর করে বেঁধে রেখে মালামাল লুট, কুমিল্লার লালমাইয়ে কথা কাটাকাটির জেরে ওমর ফারুক মজুমদার নামে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক চালককে পিটিয়ে হত্যা, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বেলাল হোসেন নামে এক অটোরিকশা চালকের মরদেহ উদ্ধার, খুলনায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আরিফ নামে এক মাংস বিক্রেতাকে হত্যা, গাজীপুর সদর উপজেলায় এক অটোরিকশা চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাই, রাজধানীতে আইনজীবীসহ ৪ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু, নীলফামারীর ডিমলায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে।

সারা দেশেই অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে। দেশের আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শান্তিকামী মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছে। অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে  যেমন বের হয়ে যায়, তেমনি দুর্বল অভিযোগপত্রও অনেক অপরাধীকে সহজে মুক্তি  পেতে সাহায্য করে। এই সুযোগে অপরাধীচক্র ফিরে আসে জনপদে। নতুন করে সক্রিয় হয় অপরাধে। প্রচলিত আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধগুলো ফিরিয়ে আনতে হবে। যদিও অনেকেই বলছেন দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে অবনতি ঘটানো হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সেখানে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। স্যাবোটাজ হতে পারে। এমনকি নতুন কোনো প্লট তৈরির জন্যও পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা। এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটি প্রকট আকার ধারণ করেছে, তা হলো কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না? এটা যদি পরিকল্পিতও হয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাই সরকারের কাজ। আগামীর পথচলাকে নিরাপদ করতে চাইলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া বিকল্প নেই। জনগণ যেন নিজেকে অনিরাপদ না ভাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত