নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৫, ০১:২০ পিএম

জম্মু ও কাশ্মিরের পেহেলগামে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। এখন পরিস্থিতি সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিধর দেশ দুই পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানালেও, ভারত এখন সংঘাত এড়াতে নয়, বরং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।

গতকাল রবিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাশ্মিরে হামলার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক ডজনেরও বেশি দেশের নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন এবং দিল্লিতে অবস্থিত শতাধিক কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেছেন। তবে এই প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়ার জন্য নয়, বরং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বৈধতা তুলে ধরার কৌশল হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে চারজন কূটনীতিক কর্মকর্তা।

গত বৃহস্পতিবার এক ভাষণে মোদি সরাসরি পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করলেও সন্ত্রাসী আস্তানা ধ্বংস ও কঠোর শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেন। দুই দেশের সীমান্তে টানা কয়েক রাত ধরে ছোট অস্ত্র দিয়ে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কেউ বলছেন তিন রাত ধরে, কেউ আবার বলছেন তিন রাতের মধ্যে দু’দিন গোলাগুলি হয়েছে।

কাশ্মিরে নিরাপত্তা বাহিনী বড় ধরনের ধরপাকড় চালিয়েছে। শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে। পাকিস্তানের দিকে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ভারত এবং পাকিস্তানি দূতাবাসের কিছু কর্মী ও ভারতে থাকা পাকিস্তানি নাগরিকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে।

পাকিস্তান পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কাশ্মির সীমান্তে যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্থগিত করেছে। এদিকে কাশ্মিরি শিক্ষার্থীরা ভারতের অন্য শহরগুলোতে ব্যাপক হয়রানির মুখে পড়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরছেন।

হামলার পাঁচ দিন পরও ভারত সরকার হামলার পেছনে কোনও নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ঘোষণা করেনি এবং পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে দৃঢ় প্রমাণ সামনে আনেনি। পাকিস্তান সরকার হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। তবে ভারতীয় কূটনৈতিকরা দাবি করেছেন, কিছু প্রযুক্তিগত প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা হামলাকারীদের পাকিস্তানের সঙ্গে সংযোগের ইঙ্গিত দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, শক্ত প্রমাণের অভাবে ভারত হয়ত আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য সময় নিচ্ছে বা মনে করছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছাড়াই এখন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। বর্তমানে ভারতের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক চাপের প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক কম।

ইরান ও সৌদি আরব দুই পক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছে, ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সংযমের আহ্বান জানালেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় শক্তিগুলো অন্য সংকটে ব্যস্ত, ফলে ভারত নিজেদের কার্যক্রমে অনেকটা স্বাধীন মনে করছে। 

যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি দুই দেশেরই বন্ধু, তবে দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। দক্ষিণ এশিয়া ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার তালিকায় নিচে রয়েছে বলেও ইঙ্গিত মিলেছে, কারণ এখনো ভারতে কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ হয়নি।

বিশ্লেষক ড্যানিয়েল মার্কি সতর্ক করেছেন, উভয় পক্ষই নিজেদের সক্ষমতা অতিরঞ্জিত করছে, ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে এবার হামলাকারী গোষ্ঠী ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ আগে তেমন পরিচিত ছিল না, যাকে ভারতীয় কর্মকর্তারা লস্কর-ই-তৈয়বার ছায়া সংগঠন বলে মনে করছেন।

ভারতের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেনন বলেছেন, মোদি সরকারের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। ২০১৬ এবং ২০১৯ সালের মতো এবারও সামরিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মেনন আশাবাদী, দুই দেশই সংঘাতকে একটি নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখবে।

পরিস্থিতি এখন এমন যে, পরিষ্কার প্রমাণ প্রকাশ ছাড়াই ভারত পাকিস্তানের অতীতের সন্ত্রাসবাদের ইতিহাস তুলে ধরে সামরিক হামলার ভিত্তি তৈরি করছে। কূটনৈতিক মহল থেকে একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এক কূটনীতিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘শুধু অতীতের রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে কি আপনি পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবেন?’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত