সংঘাতের ছায়ায় ক্রিকেট, আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় আইপিএল-পিএসএল

আপডেট : ০৯ মে ২০২৫, ০৩:০৮ পিএম

স্টেডিয়ামগুলো আজ নির্বাক থাকবে। গ্যালারিজুড়ে শূন্যতা। মাঠে থাকবে না বলের তোপ-ঘূর্ণি, হবে না ব্যাটের ঝনঝনানি। অথচ দুদিন আগেই এই মাঠগুলোতে ঝড় তুলেছিলো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, গর্জে উঠেছিলো সমর্থকদের কণ্ঠস্বর। কোটি টাকার চুক্তি, আরব সাগরের হাওয়ায় উড়তে থাকা জার্সি আর সেই জার্সির বুকে লেখা একেকটি শহরের নাম। সব মিলিয়ে উপমহাদেশজুড়ে বসেছিলো এক বর্ণিল উৎসবের আসর।

কিন্তু রাজনীতির খড়গ এসে এক মুহূর্তে থামিয়ে দিলো ক্রিকেট নামের সেই মহা উৎসব। আইপিএল আর পিএসএল—দুই দেশের দুই প্রাণপ্রিয় টুর্নামেন্টই এখন পড়েছে সংঘাতের ছায়ায়। একদিকে যুদ্ধংদেহী মনোভাব, অন্যদিকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা। কোথায় হবে টুর্নামেন্ট দুটির বাকি ম্যাচগুলো? ঘরের মাঠে না বিদেশে? আর এই সিদ্ধান্তের পেছনেই লুকিয়ে আছে হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব। কারণ ক্রিকেট এখন অর্থনীতি, কূটনীতি, বিনোদন আর জাতীয় পরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। তাই মাঠের বাইরের এই অদৃশ্য লড়াইয়ের প্রভাব শুধু খেলোয়াড় কিংবা দর্শকের ওপরই নয়, আঘাত হানে পুরো একটি দেশের ক্রীড়ানির্ভর ব্যবসায়িক চক্রে।

চলতি আসরে আইপিএলের ফাইনালসহ বাকি ২৬ ম্যাচ, আর পিএসএলের ৮টি। রাজনৈতিক অস্থিরতায় দুটোই স্থগিত হয়েছে, যদিও সম্পূর্ণ বাতিল হয়নি। পিসিবি ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, পিএসএলের বাকি ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। বিপরীতে বিসিসিআই এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবে সামরিক উত্তেজনার মাঝে দেশের মাটিতে আয়োজন কঠিন বলেই ধরে নেওয়া যায়।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে প্রশ্ন—বিদেশে আয়োজন মানে কি লাভের খাতা ম্লান হয়ে যাওয়া? উত্তরটা এতটা সহজ নয়, তবে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ঘরের মাঠ ছেড়ে বিদেশে পা রাখলে অর্থনীতির ময়দানে দুই বোর্ডই পড়বে ভারী ক্ষতির মুখে।

ঘরের মাঠে আয়োজন মানেই বিপুল রাজস্ব। সেই রাজস্ব হারানোর শঙ্কায় বিসিসিআই। সম্প্রচারস্বত্বই যেখানে প্রতিযোগিতাটির সবচেয়ে বড় আয়, সেখানে দেশের মাঠে প্রতিটি ম্যাচ যত বেশি সম্প্রচার হয়, আয়ের পরিমাণ তত বাড়ে। ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের জন্য আইপিএলের সম্প্রচারস্বত্ব বিক্রি হয়েছে ৪৮ হাজার ৩৯০ কোটি রুপিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা)। এর মধ্যে প্রতি মৌসুমে বিসিসিআই পায় প্রায় ৯ হাজার ৬৭৮ কোটি রুপি (প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা)। অর্থাৎ যত বেশি ম্যাচ, তত বেশি সম্প্রচার আয়—এটাই সরল হিসাব।

টিকিট বিক্রি বা গেট রেভিনিউয়েও বিশাল একটি অংক। প্রতিটি ম্যাচে গড়ে ৩০ থেকে ৫০ হাজার দর্শক মাঠে উপস্থিত থাকেন, যেখান থেকে আয় হয় ৪–৫ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা)। ২৬টি ম্যাচ হলে এই খাত থেকেই আয় হতো প্রায় ১০০ থেকে ১৩০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪৫ থেকে ১৮৯ কোটি টাকা)।

এছাড়া মাঠভিত্তিক বিজ্ঞাপন, এলইডি ব্যানার ও অফলাইন প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয় স্পনসররা যে ব্র্যান্ড এক্সপোজার পান, তা দেশের মাটিতেই সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ঘরের মাঠে আয়োজন মানেই স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য। হোটেল, রেস্তোরাঁ, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং অস্থায়ী চাকরির সুযোগে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হয়। রাজ্য ক্রিকেট সংস্থাগুলোও আয় পায় প্রতিটি ম্যাচের ভিত্তিতে।

কিন্তু বিদেশে এসব সুবিধা আর থাকে না। বরং বাড়ে খরচের অংক। গেট রেভিনিউ প্রায় শূন্যের কোঠায়, কারণ প্রবাসী দর্শকসংখ্যা কম। ২০১৪ সালে ভারতের সাধারণ নির্বাচনের কারণে আইপিএলের প্রথম ২০টি ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই ম্যাচগুলোতে মোট দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ২.৮ থেকে ৩ লাখ, যা প্রতিম্যাচে গড়ে ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার দর্শক। শুধু এসবই নয়, টিকিটের দামও কম থাকে। স্থানীয় বাজারে ব্র্যান্ড এক্সপোজারের সুযোগ না থাকায় স্পনসররাও চুক্তি স্থগিত রাখেন কিংবা ছাড় চান।

সবচেয়ে বেশি ধাক্কা আসে আয়োজন ব্যয়ে। বিদেশে ম্যাচ আয়োজন মানে ভেন্যু ভাড়া, নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসনসহ নানা খাতে খরচ বেড়ে যায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ২৬টি ম্যাচ বিদেশে আয়োজন করতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়াতে পারে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৪৩৫ থেকে ৫৮০ কোটি টাকা)।

সব মিলিয়ে বিসিসিআইয়ের মোট ক্ষতির অংক দাঁড়াতে পারে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কোটি রুপি (বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ২ হাজার ১৭৫ থেকে ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা)। শুধু আর্থিক নয়, সময়ক্ষেপণ, লজিস্টিক জটিলতা এবং দর্শক-সংযোগ হারানো—এই ক্ষতিও কম নয়।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের পিএসএল আকারে ছোট হলেও অর্থনৈতিক গুরুত্বে পিছিয়ে নেই। পিএসএলের একটি পূর্ণ মৌসুম থেকে পিসিবি আয় করে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫৫০ থেকে ৬৬০ কোটি টাকা)। দেশীয় মাঠে আয়োজিত হলে এই টুর্নামেন্ট থেকে আয় হয় টিকিট বিক্রি ও স্থানীয় স্পনসরশিপের মাধ্যমে। প্রতিটি ম্যাচে গেট রেভিনিউ আসে ২ থেকে ৩ লাখ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা)।

ঘরের মাঠে খেলা হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরিয়ে আনার একটি ইতিবাচক বার্তা যায় বিশ্বদলের কাছে। স্থানীয় দর্শকদের অংশগ্রহণও বাড়ে।

তবে এবার পিএসএলের বাকি ৮টি ম্যাচ আয়োজন করা হবে দুবাইয়ে। পিসিবি ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। বিদেশে আয়োজনে প্রতি ম্যাচে খরচ হয় গড়ে ১ থেকে দেড় লাখ ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা)। ৮টি ম্যাচে মোট আয়োজন ব্যয় দাঁড়াতে পারে ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৬ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২২ কোটি টাকা)।

দুবাইয়ে গেট রেভিনিউ থাকে প্রায় শূন্য, কারণ দর্শক সংখ্যা কম, টিকিট বিক্রি কম, আর মাঠভিত্তিক পণ্য বিক্রির সুযোগ নেই বললেই চলে। পাকিস্তানের স্থানীয় স্পনসররাও বিদেশি ভেন্যুতে কম সাড়া দেন।

ফলে সব মিলিয়ে পিএসএলের এই ৮টি ম্যাচ বিদেশে সরানোয় পিসিবির ক্ষতি হতে পারে আনুমানিক ৪ থেকে ৬ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ থেকে ৬৬ কোটি টাকা)।

তুলনামূলক বিশ্লেষণে স্পষ্ট, ক্ষতির গ্রাফে অনেক এগিয়ে আছে আইপিএল। কারণ টুর্নামেন্টের ম্যাচ সংখ্যা বেশি, দর্শকঘনত্ব অনেক বেশি এবং সম্প্রচার স্বত্বের মূল্য অনেক উঁচু। আর তাই বিদেশে আয়োজনের সিদ্ধান্ত বিসিসিআইয়ের জন্য হতে পারে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা।

অন্যদিকে, পিএসএলের ক্ষতি তুলনামূলক কম হলেও তা একেবারে উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ পাকিস্তানের মতো একটি ক্রিকেট নির্ভর দেশে এই ধরনের রাজস্ব ক্ষতি মানে ক্রিকেটের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও ভাটা পড়া।

শেষ পর্যন্ত খেলা মাঠে ফিরবেই। তবে সেই মাঠটা কোন দেশের মাটি হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে দিচ্ছে রাজনীতি। আর রাজনীতির আগুনে যখন ক্রিকেট পুড়ে ছাই হয়, তখন শুধু ব্যাট-বল নয়—ভস্মীভূত হয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও কোটি মানুষের ভালোবাসার নির্ভেজাল খেলা ক্রিকেট।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত