‘ছায়া থেকে’ আলোয় আসা নায়ক ওয়াসিম

আপডেট : ২০ মে ২০২৫, ০৬:৫১ পিএম

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং চার্টে এক নম্বরে আছেন তিনি। না, কোনো ফুল মেম্বার দেশের ক্রিকেটার নন। তার ঝকঝকে নাম নেই আইপিএল বা বিগ ব্যাশে। কিন্তু রান? বাকিদের চেয়ে ঢের বেশি। বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে গত তিন বছরে সবার ওপরে যে নামটি জ্বলজ্বল করছে, সেটি কোনো সূর্যকুমার নয়, বাটলার নয়, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলও নয়। সেই নাম হলো পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিয়াঁ চান্নু শহর থেকে উঠে আসা সেই ক্রিকেটারের নাম মুহাম্মদ ওয়াসিম।

২০২১ সালের ৫ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতের হয়ে তার অভিষেক। তারপর থেকে ওয়াসিম খেলেছেন ৭১টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি। এই সময়ে তার চেয়ে বেশি রান করতে পারেননি বিশ্বের কেউ। এমনকি ওয়াসিমের চেয়ে ৫ ইনিংস বেশি খেলেও ১৯২ রান কম করেছেন ভারতের সূর্যকুমার যাদব। তার গড় দেখলেও চোখ কপালে উঠবে, ৪০.১৬। আর স্ট্রাইক রেট ১৫৬.১২। তার ঝুলিতে আছে তিনটি সেঞ্চুরি আর ২২টি ফিফটি।

এই রানযজ্ঞের পথে ওয়াসিম হাঁকিয়েছেন ১৬৫টি ছক্কা—যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ছক্কা হাঁকানো দুই ব্যাটার মাহমুদউল্লাহ (৭৭) ও লিটন দাসের (৬০) সম্মিলিত ছক্কার সংখ্যার (১৩৭) চেয়েও অনেক বেশি! এক কথায়, টি-টোয়েন্টিতে ‘সহযোগী দেশ’ হলেও তার ব্যাটিং যেন ভয়ঙ্কর কোন ফুল মেম্বার দলের স্টাইলিশ ওপেনারের চেয়েও জোরালো।

বলা হয়, ক্রিকেট প্রতিভা জন্ম নেয় যেকোনো জায়গায়। মুহাম্মদ ওয়াসিম তার জীবনের প্রথম বল খেলেছিলেন পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিয়াঁ চান্নুর এক গলিতে—টেপ টেনিস বল দিয়ে। ১৬ বছর বয়সে শুরু, ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন রশিদ লতিফের একাডেমিতে। ক্রিকেটের প্রথাগত শিক্ষাটা সেখানেই। এরপর ভাগ্য টেনে নেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতে—চাকরি, রেসিডেন্সি ভিসা, আর তার পর ব্যাট হাতে দেশটির মুখ হয়ে ওঠা।

এই সিরিজেই তার ব্যাটের তেজের সাক্ষী বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে করেন ৩৯ বলে ৫৪ রান। দ্বিতীয় ম্যাচে আরও বিধ্বংসী রূপে, মাত্র ৪২ বলে ৮২ রান। বাংলাদেশ ইনিংসের প্রথম বলেই ক্যাচ ফেলেছিল, তখন ওয়াসিমের রান শূন্য। আরেকবার ক্যাচ উঠল ৬৪ রানে—তখনও ফসকে গেল সুযোগ। তিনি পরে দাঁড়িয়ে রইলেন জয়ের নায়ক হয়ে—তার ঝড়ে ভেসে গেল ২০৫ রানের লক্ষ্য।

বাংলাদেশের ফিল্ডিং, বোলিং—সবই ধরা খেয়েছে। শিশির ছিল, শরিফুলের ওভারথ্রো ছিল, তানজিমের ফুলটস ও নো বলও ছিল। কিন্তু এ দায় দিয়ে কি ২০৫ রানের মতো লক্ষ্য রক্ষা না করার ব্যাখ্যা চলে?

উল্টো দিকের গল্পটাও গুরুত্বপূর্ণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই সিরিজেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। নতুন ৫ ক্রিকেটার স্কোয়াডে, আর সর্বশেষ টুর্নামেন্টে তারা হার মানিয়েছিল সৌদি আরবের কাছেও। তবে সেই দলের কাছেই বাংলাদেশের হার, আর ম্যাচ শেষে অধিনায়কের মুখে বারবার ‘শিশির’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি—এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনাই বটে।

এই অবস্থায় একটা কথা না বললেই নয়। হংকং, স্কটল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে ‘সহযোগীদের ক্রিকেট উন্নয়নে অবদান’ রাখার এই ধারাবাহিকতায় এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতও যুক্ত হলো। বাংলাদেশ চাইলে একে কূটনৈতিক সাফল্যও বলতে পারে!

আর ওয়াসিম? মাঠে সতীর্থরা তাকে ডাকেন ‘বাব্বা’ নামে। হয়তো বয়সের তুলনায় পরিণত ভাব, দায়িত্বশীল মেজাজ, বা কেবল স্নেহভরে দেওয়া একটি ডাক। এখন এই নামই হয়ে উঠেছে পরিচয়ের অংশ।

বড় দল, ছোট দল—সব তফাৎ পেরিয়ে মুহাম্মদ ওয়াসিম বুঝিয়ে দিচ্ছেন, প্রতিভা সুযোগ পেলেই আলো ছড়ায়। আর বাংলাদেশ? সেই আলোয় ঝলসে যাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত