সিজেপির প্রতিবেদন

‘ঠেলে দেওয়া হচ্ছে’ বাংলাদেশে, আতঙ্কে আসামের হাজার হাজার নারী-পুরুষ

আপডেট : ০৫ জুন ২০২৫, ০৯:১৯ পিএম

অবৈধভাবে আটক ও সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আতঙ্কে কয়েকদিন ধরে ভারতের আসাম রাজ্যের হাজার হাজার দরিদ্র ও নিম্ন শ্রেণির মানুষ ‘নিদ্রাহীন’ রাত কাটাচ্ছেন। জানা গেছে, কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই রাজ্যের ৩৩টি জেলায় অভিযান চালাচ্ছে দেশটির পুলিশ। নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে ‘নারী, শিশু ও পুরুষদের’ বেআইনিভাবে আটক করে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করছে তাদের।

ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সিটিজেনস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিসের (সিজেপি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদন তৈরিতে তারা ছয়জন ভুক্তভোগী নারীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যারা পুলিশি হয়রানির শিকার।

ছয় নারী হলেন—হাজেরা খাতুন, সোনা বানু, রহিমা বেগম, জাহানারা বেগম, আসিফা বেগম ও সাহেরা খাতুন। এ প্রতিবেদন তৈরিতে আসামের কিছু সাংবাদিক ও সমাজকর্মীও অংশ নেন।

সিজেপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ মে থেকে হঠাৎ করেই রাজ্যের ৩৩টি জেলায় পুলিশি অভিযান শুরু হয় এবং ‘কোনো নথিভুক্ত মামলা, নোটিশ বা আইনি যৌক্তিক ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রায় ৩০০ মানুষকে আটক করা হয়।

সাংবিধানিক ও আইনি নিয়ম লঙ্ঘন করে বন্দীদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবার এবং আইনজীবীদের কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। যদিও প্রায় ১৫০ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে অসমর্থিত প্রতিবেদনগুলো বলছে, নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য এখনো আদালতে লড়ছেন, এমন ১৪৫ জনকে জোর করে সীমান্তের ওপারে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যারা আটক হয়েছেন, তাদের অনেককে বিদেশি ট্রাইব্যুনাল বিদেশি হিসেবে ঘোষণা করেছে। কেউ কেউ জামিনে মুক্ত, কেউ আবার নাগরিকত্ব প্রমাণে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অন্য দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্বাসন আদেশ বা দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি। এতে তাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

আসামের পুলিশের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার এমন একজন হলে রাজ্যের বরপেটা জেলার ভাল্লুকি গ্রামের ষাটোর্ধ্ব হাজেরা খাতুন। গত ২৫ মে বেআইনিভাবে আটক করা হয় বলে অভিযোগ। এর আগেও তাকে একবার আটক করা হয়েছিল এবং মামলা এখনো গৌহাটি হাইকোর্টে চলমান। হাজেরা বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।

হাজেরা জানান, তাকে এবং অন্যদের বরপেটা জেলা থেকে বাসে করে ৯১ কিমি দূরের মাটিয়া বন্দিশিবিরে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হয়। বাসে বসিয়ে রাখার পর সামান্য ভাত দেওয়া হয়। পরে তাদের ছবি তোলা হয় এবং হাতে কিছু বাংলাদেশি টাকা দিয়ে সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। বাস থেকে নামিয়ে বলা হয়, নিজেদের মধ্যে কোনো কথা বলা যাবে না।

সেখানে তাদের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয় এবং রাতভর বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পরদিন সকালে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে কেন তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে এসেছেন। পরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।

হাজেরা জানান, পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা চললেও তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ সময় তাদের দলের ওপর এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর প্রতিবাদের কারণে খায়রুল ইসলাম নামে এক শিক্ষককে মারধর করা হয়। পরে তারা নিজেরাই ভারতের দিকে হাঁটা শুরু করেন।

হাজেরার ছেলে জানান, ৩১ মে রাত ১১টার দিকে খবর পান, হাজেরা ও সোনা বানু নামের এক নারী গোয়ালপাড়া জেলার মহাসড়কে অবস্থান করছেন। স্থানীয় এক ছাত্রনেতাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন।

বাকিদেরও কমবেশি একই অভিজ্ঞতা বলে জানিয়েছে সিজেপি। তবে তারা হয়তো অন্য দলে ছিলেন বা অন্য কোনো সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তাদেরও বৃষ্টির মধ্যে দুই দেশের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চলে এক বা একাধিক রাত কাটাতে হয়েছে। মাথার ওপর কোনো ছাদ ছিল না। বয়স্ক ও নারীদের অনেককেই অসুস্থ অবস্থায় ভেজা কাপড়ে দুই দেশের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ অঞ্চলে সারা রাত দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে বা পানির মধ্যে ধানখেতে বসে থাকতে হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একদিকে বহু মানুষ নিখোঁজ; অন্যদিকে, পুলিশ বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষ কেউই নিখোঁজদের সম্পর্কে পরিবারকে ব্যাখ্যা দিচ্ছে না, যাদের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। অনেক ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ, তারা থানায় একটি এফআইআর নথিভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পুলিশ তা নথিভুক্ত করেনি, যার পরে তারা ডাকযোগে স্থানীয় এসপির কাছে তাদের অভিযোগ পাঠিয়েছিল।

এদিকে বড় ধরনের কোনো প্রতিবাদ না হলেও আসামের বহু মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কারা এই নির্দেশ জারি করল এবং কেন ভারতীয় নাগরিকদের, এমনকি বিতর্কিত নাগরিকত্বধারীদেরও কেন এভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হলো, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত