ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসনবিরোধী অভিযান ঘিরে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে শহরের কিছু অংশে রাত্রীকালীন কারফিউ জারি করেছেন মেয়র কারেন ব্যাস। কারফিউ রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলবে এবং প্রায় এক বর্গমাইলজুড়ে ডাউনটাউন এলাকায় প্রযোজ্য হবে। মেয়রের আশঙ্কা, কারফিউ কয়েকদিন চলতে পারে।
শহরের নিরাপত্তা রক্ষায় এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশের প্রধান জিম ম্যাকডোনেল। তিনি জানান, টানা কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে এবং শনিবার থেকে শহরে বেড়েছে অবৈধ ও বিপজ্জনক আচরণ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিক্ষোভকারীদের ‘পেশাদার উসকানিদাতা’ ও ‘জন্তু’ বলে আখ্যা দেন। মঙ্গলবার উত্তর ক্যারোলিনার ফোর্ট ব্র্যাগে সেনা সদস্যদের সামনে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে সেনাদের মধ্যে কেউ কেউ করতালি দেন এবং উল্লাস প্রকাশ করেন।
একদিন আগেই লস অ্যাঞ্জেলেসে মোতায়েন করা হয় মার্কিন মেরিন সেনা। একইসঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৪,০০০ ন্যাশনাল গার্ড সদস্য। শহরের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসন এই ব্যবস্থা নিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “আপনারা যা দেখছেন, তা শান্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আক্রমণ। যারা বিদেশি পতাকা নিয়ে দাঙ্গা করছে, তারা যেন আমেরিকায় একটি বিদেশি অনুপ্রবেশ চালাতে চায়। আমরা তা হতে দেব না।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো শহরকে বিদেশি শত্রুর হাতে তুলে দেব না। এরা শত্রু।”
যদিও ফোর্ট ব্র্যাগে এই ভাষণ সেনাবাহিনীর ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া হয়, তবে মূলত বক্তব্যে ছিল বিক্ষোভ নিয়ে তাঁর ক্ষোভের প্রকাশ। সেনাদের সামনে বক্তব্যের সময় ট্রাম্পের পেছনে দাঁড়ানো কিছু সেনা সদস্য সংবাদমাধ্যম, গভর্নর গ্যাভিন নিউজম, ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেট এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে বিদ্রূপ করেন।
পেন্টাগনের নীতিমতে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশনা থাকলেও, ফোর্ট ব্র্যাগের এক মুখপাত্র জানান— সেনাদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে নিষেধ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এই বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে সমালোচনা উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে তিন দশকের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো মেরিন সেনা মোতায়েন করা হলো। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজ্য ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মঙ্গলবার, ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তারা সান ফ্রান্সিসকোর এক ফেডারেল বিচারকের কাছে আবেদন জানান যেন মেরিন সেনা বা ন্যাশনাল গার্ডকে আইনশৃঙ্খলা কাজে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আদালতে জমা দেওয়া নথিতে বলা হয়, সেনা মোতায়েন ও ফেডারেল হস্তক্ষেপের কারণে লস অ্যাঞ্জেলেস ও পুরো রাজ্য অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে। এই বিষয়ে বৃহস্পতিবার শুনানি হওয়ার কথা।
সেইদিন কংগ্রেসের হাউস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ সেনা মোতায়েনের পক্ষে কথা বলেন। বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী, লুটেরা ও গুণ্ডা’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক ব্রিন ম্যাকডোনেল জানান, সেনা মোতায়েন, খাবার, পরিবহনসহ পুরো অভিযানের ব্যয় দাঁড়াতে পারে অন্তত ১৩৪ মিলিয়ন ডলার।
মঙ্গলবারের ভাষণে ট্রাম্প মেরুন টুপি পরে বলেন, “বিপজ্জনক ও সহিংস জনতা এবং কিছু চরমপন্থী বামদের হামলা থেকে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রক্ষা করতেই সেনা মোতায়েন করেছি।” বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এরা জন্তু।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সেনারা বিদেশে জীবন দেয়নি যেন দেশে ক্যালিফোর্নিয়ার মতো আইনহীনতা দেখে যেতে হয়। আমি দেশের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে এটা মেনে নেব না।”
এর আগে মঙ্গলবার, ট্রাম্প ঘোষণা দেন— ওয়াশিংটন ডিসিতে সেনাবাহিনীর বার্ষিক কুচকাওয়াজে কেউ বিক্ষোভ করলে তাকে ‘তীব্র শক্তির মুখোমুখি’ হতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম এক্সে পোস্ট করে হেগসেথের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি লেখেন, হেগসেথ অবৈধভাবে সেনা নামিয়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কুচকাওয়াজে তাঁকে সহায়তা করছেন।
বিক্ষোভ শুরু হয় গত শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শহরের বাইরেও। সোমবার রাতভর বিক্ষোভ চলাকালে লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করে, বেশিরভাগই ‘বিচ্ছুরণ আদেশ অমান্য’ করার অভিযোগে।
মঙ্গলবার দুপুরে ডাউনটাউনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন ছিল। তারা দাঙ্গা প্রতিরোধের ঢাল হাতে মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের বাইরে চক্রাকারে দাঁড়িয়েছিল। সেখানে শ্রমিক নেতা ডেভিড হুয়ের্তা সোমবার পর্যন্ত আটক ছিলেন।
পুলিশ জানায়, ওই এলাকায় কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বস্তু ছোড়া হলে 'অবৈধ সমাবেশ' ঘোষণা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশের একটি ফেডারেল ভবনের দেয়ালে লেখা ছিল “সব আইস এজেন্টকে হত্যা করো” ও “যখন অত্যাচার আইন হয়, বিদ্রোহ দায়িত্ব”— এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলেন রক্ষণাবেক্ষণকর্মীরা।
বিকেলে পুলিশ ডিটেনশন সেন্টারের সামনে একদল বিক্ষোভকারীকে ঘিরে ফেলে এবং তাদের সারিবদ্ধভাবে দেওয়ালের পাশে বসিয়ে রাখে। এক বিক্ষোভকারীর ভাই হুয়ান পান্তোজা বলেন, তাঁর ভাই স্কুটার চালিয়ে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ই ধরা পড়েন। তিনি বলেন, “বিক্ষোভের পক্ষে আমি, তবে এসব ভাঙচুর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পুলিশের রাবার বুলেট ছোড়াও একইভাবে মাত্রাতিরিক্ত।”
পরে লিটল টোকিও এলাকায় একদল বিক্ষোভকারী মেক্সিকান ও মিশ্র পতাকা নিয়ে র্যালি করেন।
যদিও কর্মকর্তারা বলছেন সেনাদের দায়িত্ব সীমিত, তবে অনেকের আশঙ্কা— এই মোতায়েন ভবিষ্যতে অন্যান্য শহরেও সামরিক হস্তক্ষেপের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
মেয়র কারেন ব্যাস বলেন, “আমরা মনে করছি, লস অ্যাঞ্জেলেসকে একটি বড় সরকারি পরীক্ষার অংশ বানানো হয়েছে। দেখা হচ্ছে, কী ঘটে যখন ফেডারেল সরকার সরাসরি কোনো রাজ্য বা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।”
৭০ জনেরও বেশি নিহত ফিলিস্তিনি
রাজশাহীতে রেলপথ অবরোধ, সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ
মাদারীপুরে বৈষম্যবিরোধী নেতাদের ওপর হামলা
কলম্বিয়ার কাছে আবার হোঁচট খেলো আর্জেন্টিনা