লিওনার্দোর ‘মোনালিসা’ এখন জয়নুলের ‘দুর্ভিক্ষ’

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৫, ১২:৪৩ পিএম

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা চিত্রকর্ম ‘দ্য মোনালিসা’ দেখতে প্রতি বছর প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরে ভিড় করেন কোটি দর্শনার্থী। চিরায়ত সৌন্দর্যের উপমা হিসেবে অনেকেই দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসা ছবিটিকে সামনে আনেন। যেমনটা ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার ও সাবেক পেসার ইয়ান বিশপ ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লিটন দাসের একটি শট দেখে মুগ্ধ হয়ে অন এয়ারে বলেছিলেন যে লিটন যেন ঘাসের ক্যানভাসে ব্যাটকে তুলি বানিয়ে মোনালিসা’র মতো ছবি আঁকেন! তবে সাম্প্রতিক সময়ে লিটনের ব্যাটিংয়ের সেই শৈল্পিক সুষমা হারিয়ে গেছে। বরং তার ব্যাটিং যেন এখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষ সিরিজের ছবির প্রতিবিম্ব। বাংলার ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে জয়নুলের কালজয়ী দুর্ভিক্ষ সিরিজে যেমন চোখে পড়ে খাদ্যের অভাবে অস্থিচর্মসার শরীর, সাদা বলে লিটনের ইনিংসগুলোও তেমন। রান নেই, থাকলেও তাতে প্রাণ নেই অর্থাৎ দলের কোনো কাজে আসে না সেসব ইনিংস।

আগামী বছরের শুরুতে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরবর্তী আসর। লিটন দাসকে সেই আসর পর্যন্ত টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। তবে লিটনের ব্যাটিংয়ের যা দশা, তাতে একাদশে তার টিকে থাকাই দুষ্কর। ওয়ানডে দল থেকে ছিটকে গেছেন একই কারণে, টি-টোয়েন্টিতে টিকে আছেন স্রেফ অধিনায়ক কোটায়।

পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ক লিটন নেমেছেন ওয়ান ডাউনে। তানজিদ হাসান তামিমের বিদায়ে লিটন যখন উইকেটে গেছেন, তখন স্কোরবোর্ডে রান ৫ ওভারে ৪৬, সেখান থেকে লিটন খেলেছেন ১১ বলে ৬ রানের এক দায়িত্বশীল (!) ইনিংস। কোনো বাউন্ডারি নেই। ৫টা ডট, ৪টা সিঙ্গেল, একটা ডাবলস আর ১১তম বলে তো আউটই হলেন। লেগস্পিনার জেফরি ভ্যান্ডারসের বলে সুইপ করতে গিয়েছিলেন, ব্যাট বল মিস করায় পায়ে লাগে বল। আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। এর এক বল আগেই ভ্যান্ডারসের গুগলিতে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, বল অল্পের জন্য স্টাম্পে না লেগে চলে যায় সীমানার বাইরে, বাংলাদেশ পায় বাই ৪ রান। দুই তরুণের আশাব্যঞ্জক শুরুর পর অধিনায়কের এমন নেতিবাচক ব্যাটিংই গোটা বাংলাদেশের ইনিংসের ছন্দটা নষ্ট করে দেয়। তাকে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েই হয়তো বছর তিনেক পর টি-টোয়েন্টি দলে ফেরা নাঈম শেখ খেলেন ২৯ বলে অপরাজিত ৩২ রানের স্বার্থপর ইনিংস।

এই একই রকম স্বার্থপর ব্যাটিং লিটন করেছেন কিছুদিন আগে, লাহোরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে। ম্যাচের প্রথম ১০ ওভারে ১০০ রানের জুটি গড়েছিলেন বাংলাদেশের দুই ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও পারভেজ হোসেন ইমন। ৫ বলের ভেতর দুজনেই আউট হওয়ার পর লিটন এবং তাওহীদ হৃদয় মিলে শুরু করেন ‘দেখেশুনে’ খেলা। ব্যাটিং স্বর্গে ১৮ বলে ২২ রানের ইনিংস খেলে দলের সম্ভাব্য রানটা কমিয়েছেন লিটন। ইংল্যান্ডের ‘দ্যা টেলিগ্রাফ’-এর সাংবাদিক টিম উইগামোরের একটি নিবন্ধ আছে, ‘দ্যা আর্ট অব ম্যাচ লুজিং ইনিংস’ অর্থাৎ ‘ম্যাচ হারানোর ইনিংস খেলার শৈল্পিক উপায়’। লিটন যেসব অল্প বিস্তর ম্যাচে রান করছেন, সেই ইনিংসগুলোয় আছে এমনই শিল্পের ছোঁয়া।

২০২৪ সালে লিটনের ওয়ানডে ম্যাচের সংখ্যা এবং রান সংখ্যা খুবই কাছাকাছি। ৫ ম্যাচে লিটন করেন ৬ রান! ০, ০, ২, ৪ ও ০। একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের  জন্য এই পরিসংখ্যান যথেষ্ট লজ্জাজনক, যে কারণে লিটন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির দলেও জায়গা হারান। তারপরও এই মৌসুমের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে লিটনের দাবি ছিল ৫০ লাখ টাকার মতো, ম্যাচপ্রতি ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই পারিশ্রমিকে লিটনকে দলে নিতে রাজি হয়নি কোনো ক্লাব, পরে  তামিম ইকবালের মধ্যস্থতায় প্রিমিয়ারে এবারে উন্নীত হওয়া গুলশান ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলেন লিটন। সেই দলের হয়ে ৬ ম্যাচ খেলে লিটনের সংগ্রহ ছিল ২৩৭ রান, সর্বোচ্চ ইনিংস ৮৩ রানের, গড় ৩৯.৫০ আর স্ট্রাইক-রেট ৯৪.৪২। সেটাই যথেষ্ট ছিল নির্বাচকদের কাছে, তাকে জাতীয় দলে ফেরানোর জন্য। প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন তাকে ওয়ানডে দলে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন ‘শেষ সিরিজে লিটন দাস ছিলেন না। আপনারা জানেন, সে সময় তিনি একটু খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা সময় তিনি ছিলেন আমাদের সেরা ফিনিশারদের একজন। সেই কারণে এবং তিনি এখন টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কও হয়েছেন’। সেই নেতৃত্বের চুম্বক তাকে ওয়ানডে দলে ফেরায় এবং প্রথম ওয়ানডেতে একাদশেও ঢুকিয়ে দেয়। সেই ম্যাচেও ০ রানে আউট হন লিটন, এরপর ওয়ানডে সিরিজের পরের দুই ম্যাচে তাকে একাদশে রাখার সাহস করেনি টিম ম্যানেজমেন্ট। টি-টোয়েন্টিতে তিনিই অধিনায়ক, তাই সবার আগে তার নামটাই লিখতে হচ্ছে, এখানে বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। সিরিজ শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে লিটন দিয়েছেন হাস্যকর যুক্তি, ওয়ানডেতে একাদশ থেকে বাদ পড়া সময়টায় নাকি করেছেন টি-টোয়েন্টির অনুশীলন, ‘ওয়ানডেতে আমি ভালো খেলতে পারিনি, যে কারণে আমি বেঞ্চে বসে ছিলাম। এ সময় টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের যতটা অনুশীলন করা যায়, সেটি আমি করেছি’। সেই অনুশীলনের প্রমাণ মিলেছে পাল্লেকেলেতে কুৎসিত ব্যাটিংয়ে।

লিটনের নেতৃত্বে আরব আমিরাতের মতো দলের কাছেও টি-টোয়েন্টি সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের সঙ্গে হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। অধিনায়ক হিসেবে এই বছর নেতৃত্ব দিয়েছেন ৭ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে, হার যার ৬টিতেই। এই ৭ ম্যাচে দুটো চল্লিশোর্ধ্ব ইনিংস লিটনের, সেসবও হারা ম্যাচে যা খেলার ফলে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলেনি। বাকিগুলো ১১, ১৪, ৬, ২২ ও ৬ রানের। মহাবীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, ‘আমি ভেড়ার নেতৃত্বে সিংহের সেনাবাহিনীকে ভয় পাই না, আমি সিংহের নেতৃত্বে ভেড়ার সেনাবাহিনীকে ভয় পাই’। লিটনের নেতৃত্বে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দল অনেকটাই প্রথমোক্ত দলের মতো, যে দলের নেতা নিজেই পশ্চাৎপদ মানসিকতার কাপুরোষচিত ক্রিকেট খেলেন এবং পারফরম্যান্স নয় স্রেফ অধিনায়ক কোটায় দলে টিকে আছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত