পতনে পদহারা পুতুল-টিউলিপ

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৩ এএম

জনরোষে শেখ হাসিনার পতনের ঝড় দেশ পেরিয়ে আছড়ে পড়েছে বিদেশেও। প্রথমে বোনের মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকী হারিয়েছেন ব্রিটেনের মতো দেশের মন্ত্রীর পদ। এরপর নিজের মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও হারিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আঞ্চলিক পরিচালকের পদ। অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো পুতুল-টিউলিপ তাদের পদ রক্ষা করতে পারবেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি...

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী টিউলিপ। খালা হাসিনার সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে গত বছর ৫ আগস্ট। টিউলিপকে বাধ্য হয়ে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয় গত ১৪ জানুয়ারি। আর পুতুলকে পদ ছাড়তে হলো ১১ মাস পর গত শুক্রবার (১১ জুলাই)। হাসিনা পতন তো অবধারিত কিন্তু এ দুই ঘটনা অনেকটা হতবিহ্বল করেছে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদকে (পুতুল) অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস। গত শুক্রবার ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ ইমেইলে এ তথ্য জানান তিনি।

গত শনিবার হেলথ পলিসি ওয়াচের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক ড. তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস সংস্থার অভ্যন্তরীণ এক সংক্ষিপ্ত ইমেইলে জানান, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। তার অনুপস্থিতিতে সহকারী মহাপরিচালক ড. ক্যাথরিনা বোহম সিয়ারোর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও জানান, ড. ক্যাথরিনা আগামীকাল মঙ্গলবার (১৫ জুলাই) নয়াদিল্লিতে অবস্থিত আঞ্চলিক দপ্তরে পৌঁছাবেন। পুতুলকে প্রাথমিকভাবে চার মাসের ছুটি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে পুতুলের মা শেখ হাসিনা গত বছর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে শেখ হাসিনা, পুতুল ও তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যা মামলা অব্যাহত থাকে। দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়। পুতুলের বিরুদ্ধে দুদক মাস চারেক আগে দুটি মামলা করে। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছে আদালত।

পুতুলের বিরুদ্ধে অভিযোগে রয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে শেখ হাসিনা তার কন্যা পুতুলকে আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য নিজের প্রভাব খাটিয়েছেন। এ পদের যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা তথ্য দিয়ে মেয়েকে নিয়োগ পাইয়ে দিয়েছেন। এরপর থেকেই পুতুলকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। এ বিতর্কের মধ্যেই দুদক মামলা করে।

দুদকের করা মামলায় বলা হয়েছে, পুতুল আঞ্চলিক পরিচালক হওয়ার প্রচার চালানোর সময় নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এটি বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪৬৮ ধারা (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি) ও ৪৭১ ধারার (জাল দলিল ব্যবহার) লঙ্ঘন।

গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী ব্রিটিশ রাজনীতিতে সম্পৃক্ত বঙ্গবন্ধুর আরেক মেয়ে শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ সরকারের একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ছিলেন। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির হয়ে ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছিলেন। তবে তার খালা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেন ও লন্ডনে একটি ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারির অভিযোগে টিউলিপ সিদ্দিক ১৪ জানুয়ারি মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

বঙ্গবন্ধুর দুই নাতনি টিউলিপ ও পুতুল প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত ডজনখানেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিউলিপের পর পুতুলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ আবারও সাময়িক ক্ষতির মুখে ফেলেছে আওয়ামী লীগকে। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপে আরও উঠে এসেছে, যে যেভাবেই দাবি করুক, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক কার্যালয়ের এসইএআরও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টি আওয়ামী লীগের ভেতরটায় আরেক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। দেশি-বিদেশি রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ যে সুবিধাজনক অবস্থা এখনো তৈরি করতে পারেনি, তারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে এ ঘটনা।

দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, এ দুজন ব্যক্তি আওয়ামী লীগের কোনো পদে না থাকলেও তারা দুজনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্য। ইস্যুগুলো রাজনীতিতে ‘ম্যাটার’ করে জানান তারা। আওয়ামী লীগের মনোবলে চিড় ধরানোর ঘটনা পুতুলের বাধ্যতামূলক অবসর এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে কেন্দ্রীয় একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে তারা কিছু বুঝতে পারছেন না বলে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ^বিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) চালুই করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে উদ্যোগী হয়ে, পুতুলের নির্দেশনায়। ইপনাকে এগিয়ে নিতে সরাসরি যুক্ত থাকেন পুতুল। এখানের অভিজ্ঞতা পুতুল ডব্লিউএইচওতে যুক্ত করেন।

ইপনা প্রজেক্টের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা তরুণ এক গবেষক এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ইপনায় পুতুলের কাজের অভিজ্ঞতা নেই মর্মে ডব্লিউএইচওকে তথ্য দেওয়া হয়। সর্বশেষ ডব্লিউএইচও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।’

পুতুলের এ ঘটনায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম গতকাল ফেসবুক স্ট্যাটাসে সায়মা ওয়াজেদকে ছুটিতে পাঠানো ডব্লিউএইচওর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ‘অনির্দিষ্টকালের এ ছুটিকে আমরা জবাবদিহির পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।’

ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া স্ট্যাটাসে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এর একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন, যেখানে সায়মা ওয়াজেদকে তার পদ থেকে অপসারণ করা হবে, তার সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হবে এবং এ মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্বের সততা ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা হবে। তিনি বলেন, সায়মা ওয়াজেদের অনির্দিষ্টকালের ছুটিকে আমরা জবাবদিহির পথে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।

এর আগে গত বছর ৩১ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সায়মা ওয়াজেদের সঙ্গে কাজ করতে চায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মূল অফিসের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে আগ্রহী সরকার। বিষয়টি জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে ওই সময় জানান। পরে চলতি বছর মে মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলির সময় বাংলাদেশের কর্মকর্তারা সায়মা ওয়াজেদের বিষয়ে অস্বস্তির কথা ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালককে জানান।

দুদকের অভিযোগে আরও বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) একটি অনারারি পদে রয়েছেন বলে দাবি করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করেছে। সায়মা এ দাবি ডব্লিউএইচওতে নিজের অবস্থান মজবুত করতে ব্যবহার করেন বলে অভিযোগে জানান দুদকের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম।

পুতুলের বিরুদ্ধে দুদকের আরও অভিযোগ, সূচনা ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসেবে তিনি নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন (প্রায় ২৮ লাখ) ডলার সংগ্রহ করেছেন। তবে এ অর্থ কীভাবে খরচ হয়েছে, সে বিষয়ে মামলায় বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় (প্রতারণা ও অসৎভাবে অর্থ বা সম্পত্তি হস্তান্তর) জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুতুল ইস্যুতে সব ক্ষমতাসীনকে শিক্ষা নিতে হবে বলে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে, রাষ্ট্রীয় মেশিনারি ও অর্থের অপব্যবহার এবং নানান কারসাজি করে, ইন্ডিয়ার সমর্থন ও সহায়তায় হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে তার কন্যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদে বসাতে পেরেছিলেন। ওই পদের জন্য তার উপযুক্ততা ছিল না বলে তাকে প্রার্থী হিসেবে যোগ্য দেখাতে অনেক জাল-জোচ্চুরিরও আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, হাসিনার ক্ষমতার পাশা উল্টে যাওয়ার পর দেশে দুদক তার কন্যা পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তও শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে পুতুলকে। তারাও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আমলে নিয়েছে। এসব অভিযোগে তার পদচ্যুতিও ঘটতে পারে। বাধ্যতামূলক ছুটি হয়তো সেটারই প্রথম ধাপ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত