অর্থনীতিতে আশা কফি-কাজুতে

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৫, ০৭:৪৩ এএম

দেশে কাজুবাদাম ও কফির ভোক্তা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ভোক্তা বাড়লেও চাহিদার অধিকাংশই এখনো পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে। দেশে উৎপাদন নামমাত্র। অথচ কাজুবাদাম ও কফি উৎপাদনের জন্য পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশ উপযোগী হলেও এখনো ব্যাপকভাবে চাষের আওতায় আনা যায়নি।

কৃষি বিভাগ বলছে, পার্বত্য অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এ দুটি পণ্যের। সম্ভাবনা থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে কফি কাজুবাদামের চাষ। শুধু এ দুটি পণ্যই নয়, পাহাড়ে এখন সমতলের কৃষিরও প্রসার ঘটছে।

বান্দরবানের কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে চাষ হচ্ছে আনারস। নিচু স্থানে পেঁপে, কলা, ড্রাগন, আদা, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ হচ্ছে। আদা সহ নানা পদের মসলার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে মাশরুমের। কম খরচে ভালো দাম ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় এসব ফসলের চাষ হচ্ছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ। অথচ এ অঞ্চলের মানুষের এক সময়ের ভরসাই ছিল জুমচাষ।

কৃষি বিভাগ বলছে, লাভজনক ও চাষ উপযোগী হওয়ায় পাহাড়ের কৃষিতে বৈচিত্র্য তৈরি করেছে কাজুবাদাম ও কফির চাষ। কৃষি বিভাগ ২০২১ সাল থেকেই কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে কাজুবাদাম ও কফির চাষ পাহাড়ে শুরু হয় সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই।

জানা যায়, কৃষি বিভাগের প্রকল্পের আগে পাহাড় অঞ্চলে কফির চাষ হতো ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। প্রকল্পের তিন বছরের মধ্যে এটির চাষ আরও অনেক পড়েছে। আগে যেখানে কফির চাষ হতো ৬৫ হেক্টর জমিতে সেখানে এখন ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে উন্নীত হয়েছে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, পণ্য দুটি চাষের জন্য স্থানীয়দের মধ্যে যে সচেতনতা ও বিপণন ব্যবস্থা দরকার ছিল সেটা তৈরি হওয়ায় এখন দ্রুত চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। উল্লিখিত তিনটি জেলায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমিতে পণ্য দুটি চাষের সুযোগ রয়েছে। যা চাষের আওতায় আনতে পারলে আমদানি নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব, বিশেষ করে কাজুবাজাদের ক্ষেত্রে।

দেশের কাজুবাদামের চাষকে কেন্দ্র করে ২২টির মতো প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠেছে। এই কারখানাগুলোর মধ্যে এখন ১৫টি কারখানায় নিয়মিত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল না থাকায় অনেক কারখানাই বিদেশ থেকে কাজুবাদাম আমদানি করে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ করে পুনরায় রপ্তানি করে। তবে দেশেই ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে কফির বাজার ৮০০ কোটি টাকার এবং কাজুবাদামের বাজার ৯০০ কোটি টাকার। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ হাজার টন কফির চাহিদা রয়েছে এবং ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টনের মতো কাজুবাদামের চাহিদা রয়েছে।

বান্দরবান রাংলাই চেয়ারম্যান পাড়ার য়ংয়াং ম্রো ১০০ শতক জমিতে ২৭০টি কফির চারা লাগিয়েছেন। যেগুলোতে ফলন আসতে শুরু করেছে। একেকটি চারা ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফলন দিয়ে যাবে।

য়ংয়াং ম্রো বলেন, কফি চাষের সুবিধা হলো খুব বেশি পরিচর্যা করতে হয় না। একবার বাগান করলে বছরের পর বছর ফলন পাওয়া যায় একেকটি গাছ থেকে। আবার চাহিদা বেশি থাকায় ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে।

কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক শহীদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় কফি ও কাজুবাদাম চাষের পার্বত্য অঞ্চলে মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এখন ধারাবাহিকভাবে এর চাষ বাড়ছে। যতœ কম লাগে, সংরক্ষণ ক্ষমতা বেশি এবং স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই ফসল দুটি চাষ লাভজনক হয়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, ‘ফসল দুটি চাষের কারণেই স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে। এখানে কাজু ও কফির বাগান তৈরি এবং প্রসেসিংয়ের মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।’

ফল মসলা থেকে মাশরুম-সবই হচ্ছে পাহাড়ে সরেজমিন পাহাড়ের খাঁড়া ঢাল বেয়ে বান্দরবারন সদর উপজেলার বাঘমারা বড়ুয়া পাড়ার খুকি বালা বড়ুয়ার মাশরুম খামার পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা একটি কাঠের ঘরে আধুনিক পদ্ধতিতে মাশরুমের চাষাবাদ।

উদ্যোক্তা জয় সাগর বড়ুয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে নিজের জমিতে মাশরুমের খামার করেছেন। এজন্য তিনি প্রকল্প থেকেও প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মাশরুমের চাষ আমার আর্থিক সচ্ছলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।’

তিনিই জানালেন কফি কাজুবাদামের পাশাপাশি ড্রাগন, আম, কলা, কাঁঠাল, সহ বিভিন্ন মসলারও চাষ হচ্ছে পাহাড়ে, যা কৃষকের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় বান্দরবান সদরে বেশ কয়েক একর জমিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার সেন্টার। এই সেন্টারটি মূলত মাতৃগাছের একটি প্রদর্শনী। বিভিন্ন প্রকারের মসলা, ফল থেকে শুরু করে সব ধরনের চারা মেলে এই সেন্টারে। এখান থেকেই মূলত জেলাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে এসব অর্থকরী ফসলের জাত।

এখান থেকে উন্নত জাত নিয়ে আদা, গোলমরিচ, দারুচিনি, তেজপাতা, ধনিয়া সহ বিভিন্ন মসলার চাষ বাড়ছে পাহাড়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মসলার উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় এসব মসলার জাত পাহাড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, পাহাড়ের কৃষকদের মসলা চাষে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে, প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়া যায় বলে অনেকেই এখন জুমচাষের বিকল্প হিসেবে মসলার চাষ করছে। প্রকল্পের আওতায় মসলার প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের বিষয়েও কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের টিস্যু কালচার ও হর্টিকালচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষির রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে। এই প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাশরুর বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে বান্দরবানের বালাঘাটায় স্থাপন করা হচ্ছে বিশ^মানের একটি টিসুকালচার ল্যাব। এই ল্যাব থেকে রোগমুক্ত, উন্নত জাতের ফল ও ফুলের চারা সরবরাহের মাধ্যমে পাহাড়ি কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে আমরা কাজ করছি।

এদিকে আনারস, আম, কলার মতো পণ্যগুলো পাহাড়ে আগে থেকেই চাষ হতো। কৃষি বিভাগ প্রকৃত অর্থে এসব ফলের উন্নত জাত কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করছে। নতুন ফসল হিসেবে কয়েক বছর ধরে ড্রাগন চাষের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আবার স্থানীয়ভাবে অনেকেই চাষ করছে মাশরুমের যা তাদের আর্থিকভাবে সচ্ছলতা এনে দিচ্ছে।

বান্দরবান সদরের বাঘমারা বড়ুয়াপাড়ার জয় সাগর বড়ুয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে নিজের জমিতে মাশরুমের খামার করেছেন। এজন্য তিনি প্রকল্পের কাছ থেকে সহযোগিতাও পেয়েছেন। তিনি বলেন, মাশরুমের চাষ আমার আর্থিক সচ্ছলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, তিন পার্বত্য অঞ্চলের পৌনে ২ লাখ হেক্টর জমি অনাবাদী অবস্থায় রয়েছে, যা মোট আয়তনের ১৪ শতাংশ। এসব অঞ্চলে পাহাড়ি জমির তুলনায় সমতল ভূমির পরিমাণ খুবই সামান্য। এসব পাহাড় ও টিলাগুলো বিভিন্ন প্রচলিত ও অপ্রচলিত ফল চাষের আওতায় আনার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতেই সরকার নানা প্রকল্পের মাধ্যমে চাষ বাড়ানোর কাজ করছে।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমএম শাহ্ নেয়াজ বলেন, ‘আমরা স্থানীয় জনগণের ঐতিহ্য রক্ষা করেই নতুন ধারার আধুনিক কৃষির সঙ্গে কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। এতে করে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা যেমন বাড়ছে, তেমনি আর্থিক সক্ষমতাও দৃঢ় হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত