পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে ব্যভিচারের অভিযোগে ‘অনার কিলিং’-এর নামে মরুভূমিতে নিয়ে এক উপজাতি নারী ও তার প্রেমিককে হত্যার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, বেলুচিস্তানের দগারি এলাকায় গুলি করে নিজের বোন ও প্রেমিককে হত্যা করছে এক যুবক। এমন দৃশ্য প্রকাশ্যে আসার পর পাকিস্তানজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র জনরোষ।
দেশটির সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ জানিয়েছে, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রশ্ন উঠেছে দীর্ঘদিন ধরে চলা গোষ্ঠীগত রীতিনীতির বৈধতা ও বিচারের অনুপস্থিতি নিয়ে। প্রায় সময়ই এমন হত্যাকাণ্ড চাপা পড়ে যায়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বানো বিবি নামের এক নারীকে তার ভাই জালাল সাতাকজাই গুলি করে হত্যা করেন। গুলির আগে বানো বিবিকে কোরআন হাতে দেন তার জালাল। এসময় বানো বলেন, ‘আমার সঙ্গে সাত কদম হাঁটো, তারপর আমাকে গুলি করো।’
এরপর তিনি কয়েক কদম সামনে হাঁটেন এবং পেছন ফিরে দাঁড়ান। তখন জালাল তিনটি গুলি করলে বানো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তারপর ওই নারীর প্রেমিক এহসান উল্লাহ সামালানিকেও গুলি করে হত্যা করা হয়।
ঘটনাটি মূলত কয়েক মাস আগে ঘটলেও, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর তীব্র নিন্দা জানায়। এরপরই দেশটির কর্তৃপক্ষ দ্রুত এ ঘটনায় পদক্ষেপ নেয়।
মানবাধিকার আইনজীবী জিবরান নাসির বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ড গোপনে হয়নি, প্রাদেশিক রাজধানীর কাছেই ঘটেছে। কিন্তু সরকার বা প্রশাসন কিছুই করেনি, যতক্ষণ না ২৪ কোটি মানুষ ভিডিওটি দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। এটা বিচার নয়, এটা ভাইরাল হওয়ার প্রতিক্রিয়া।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, প্রতিবছর পাকিস্তানে শত শত ‘অনার কিলিং’–এর ঘটনা ঘটে, যার অধিকাংশই নীরবেই পার পেয়ে যায়। তবে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী ও পুরুষকে ব্যভিচারের অভিযোগে মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হচ্ছে—যা দেশটিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এ ঘটনায় বেলুচিস্তানের নাসিরাবাদ জেলায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন এক উপজাতীয় নেতা ও বানোর মা গুল জান বিবিও। তবে গুলি চালানো বানোর ছোট ভাই এখনো পলাতক।
তবে গুল জান একটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, ‘আমরা কোনো পাপ করিনি। বানো ও এহসানকে আমাদের রীতিনীতি অনুযায়ী হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি জানান, বানো ২৫ দিন এহসানের সঙ্গে পালিয়ে থাকার পর বাড়ি ফিরেছিলেন।
পুলিশের দাবি, একটি জিরগা বা উপজাতীয় বিচার পরিষদ এই হত্যা নির্দেশ দিয়েছিল। বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, এটি একটি ‘টেস্ট কেস’। অবৈধ উপজাতীয় আদালতগুলো বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর ‘জাস্টিস ফর কাপল’ ও ‘অনার কিলিং’ হ্যাশট্যাগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় ওঠে। পাকিস্তান উলামা কাউন্সিল এই হত্যাকাণ্ডকে ‘অনৈসলামিক’ বলে অভিহিত করে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করার দাবি তোলে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে অনার কিলিং প্রতিরোধে আইন পাশ করা হয়, যেখানে পরিবার ক্ষমা করলেও খুনি ছাড়া পাবে না। কিন্তু মানবাধিকার কমিশন বলছে, আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল, বিশেষ করে গ্রাম ও উপজাতীয় অঞ্চলে।
