এআই কি যন্ত্রের মন!

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫, ০৪:০৯ এএম

যুগ যুগ ধরে আমরা এমন যন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছি, যা শুধু নির্দেশ পালন করবে না, বরং নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, শিখতে পারবে এবং এমনকি অনুভবও করতে পারবে। এ নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নিয়ে আমাদের আগ্রহ কেবল বিজ্ঞানভিত্তিক নয়, বরং এর সঙ্গে মিশে আছে দার্শনিক, মানবিক এবং শৈল্পিক প্রশ্ন। সিনেমা বরাবরই এই আগ্রহকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, যেখানে এআই কখনো বন্ধু, কখনো শত্রু, আবার কখনো আত্মপরিচয়ের সংকটে ভোগা এক সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু সিনেমার এই কল্পনা বাস্তবের সঙ্গে কতটা মেলে? আজকের এআই কতটা সিনেমার এআইয়ের কাছাকাছি?

এআই-এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ধারণা ১৯৫০-এর দশকে প্রথম স্পষ্ট রূপ পায়। আধুনিক কম্পিউটারের জনক বলে পরিচিত অ্যালান টুরিং ১৯৫০ সালে তার বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স’ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ‘টুরিং টেস্ট’-এর প্রস্তাব করেন। এই পরীক্ষা যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। এআই গবেষণা প্রথম গতি পায় ১৯৫৬ সালের ডার্টমাউথ কনফারেন্সে, যেখানে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘এআই’ শব্দটি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহৃত হয়। এই সম্মেলনকে এআই-এর জন্মলগ্ন বলা যেতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে এআই বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন নিয়মভিত্তিক সিস্টেম এবং লজিক প্রোগ্রামিং নিয়ে কাজ করেন। তবে ১৯৭০ এবং ৮০-এর দশকে এআই গবেষণায় এক ধরনের স্থবিরতা আসে, যাকে ‘এআই উইন্টার’ বা ‘এআই-এর শীতল যুগ’ বলা হয়। প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং ক্ষমতা এবং ডেটার অভাবে গবেষণা অনেকটাই ধীরগতিতে চলে। কিন্তু ২০০০ সালের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। ডিপ লার্নিং, বিগ ডেটা এবং উন্নত কম্পিউটিং ক্ষমতার কারণে এআই নতুন করে জাগরিত হয়। ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে বিশাল পরিমাণ ডেটা সহজলভ্য হয়, যা মেশিন লার্নিং মডেল প্রশিক্ষণের জন্য অপরিহার্য ছিল।

বর্তমান সময়ে এআই-এর চেহারা

বর্তমানে এআই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি, জেমিনি, কো-পাইলট, ডাল-ই-এর মতো এআই টুলসগুলো আমাদের যোগাযোগের ধরন, সৃজনশীল কাজ এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে শিক্ষা, নিরাপত্তা থেকে সৃজনশীলতা (লেখা, চিত্র, সংগীত) সবখানেই এআই-এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। আমরা এখন কতটা এআই-নির্ভর? ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে সুপারিশ সিস্টেম (ৎবপড়সসবহফধঃরড়হ ংুংঃবস), স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, চিকিৎসায় রোগ নির্ণয় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই তার ছাপ ফেলছে। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে স্মার্ট হোম ডিভাইস পর্যন্ত, এআই আমাদের জীবনকে আরও সহজ এবং কার্যকর করে তুলছে। তবে এআইকে ঘিরে কিছু আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। চাকরি হারানো, ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নজরদারি এআই-এর অন্ধকার দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, এই প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ হবে নাকি অভিশাপ?

সিনেমায় এআই

সিনেমা বরাবরই এআই-এর সম্ভাবনা এবং বিপদ সম্পর্কে আমাদের কল্পনাকে উসকে দিয়েছে। বিভিন্ন থিম বা ক্যাটাগরি অনুযায়ী সিনেমাগুলোতে এআইকে ভিন্ন ভিন্নরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।

অ্যালান টুরিংয়ের জীবন ও কাজ নিয়ে বেশ কিছু সিনেমা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পরিচিত হলো ২০১৪ সালের ব্রিটিশ বায়োগ্রাফিক্যাল থ্রিলার ‘দি ইমিটেশন গেম’।

এই চলচ্চিত্রটি দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গণিতবিদ, কোডব্রেকার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিংয়ের জীবনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। ছবিতে টুরিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ। চলচ্চিত্রটির প্রধান ফোকাস হলো দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় টুরিং এবং তার দল কীভাবে জার্মানদের তৈরি ‘এনিগমা’ কোড মেশিন ভেঙে ফেলেছিলেন। এই কোড ভাঙার কাজটি মিত্রশক্তির বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং ধারণা করা হয়, এর ফলে যুদ্ধ প্রায় দুই বছর কম সময়ে শেষ হয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিণতি : এনিগমা কোড ভাঙার মতো অসাধারণ কৃতিত্বের পাশাপাশি, ছবিটি অ্যালান টুরিংয়ের ব্যক্তিগত জীবন, তার সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সমকামী হওয়ার কারণে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা তার ওপর চাপানো অমানবিক রাসায়নিক কাস্ট্রেশনের (পযবসরপধষ পধংঃৎধঃরড়হ) বিষয়টিও তুলে ধরে। এই শাস্তির ফলে তিনি বিষণœতায় ভোগেন এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নেন।

এ ছাড়াও অ্যালান টুরিংকে নিয়ে আরও কিছু তথ্যচিত্র বা নাটকীয় ডকু-ফিচার তৈরি হয়েছে, যেমন ‘কোডব্রেকার’ (ঈড়ফবনৎবধশবৎ)। এটি ‘দি ইমিটেশন গেম’-এর তুলনায় টুরিংয়ের জীবন ও কাজের আরও বেশি ঐতিহাসিক নির্ভুলতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

এআই যখন বন্ধু

হার (২০১৩) : এই ছবিতে একজন মানুষের একটি অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে প্রেমে পড়ার গল্প দেখানো হয়েছে। এখানে এআই কেবল নির্দেশ পালন করে না, বরং আবেগ, সহানুভূতি এবং বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে এক গভীর সম্পর্ক তৈরি করে। এটি এআই-এর সঙ্গে মানুষের আত্মিক সংযোগের এক অসামান্য দৃষ্টান্ত।

এআই, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, (২০০১) :

স্টিভেন স্পিলবার্গের এই ছবিতে ডেভিড নামের একটি শিশু রোবটকে দেখানো হয়েছে, যে মানুষের ভালোবাসা খুঁজে বেড়ায়। এটি রোবটের মানবিক আবেগ এবং অনুভূতির ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এআই যখন হুমকি 

এক্স মাকিনা (২০১৫) : এই ছবিতে আভা নামের এক সুন্দরী কিন্তু বিপজ্জনক রোবটকে দেখানো হয়েছে, যা নিজের মুক্তি এবং অস্তিত্বের জন্য মানবীয় দুর্বলতার সুযোগ নেয়। এটি এআই-এর নৈতিকতা এবং নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তোলে।

২০০১:এ স্পেস অডিসি, (১৯৬৮) : স্ট্যানলি কুবরিকের এই ক্ল্যাসিক ছবিতে হাল-৯০০০ নামের একটি কম্পিউটার নভোচারীদের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয় এবং তাদের জীবন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এটি যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার বিদ্রোহের এক ভয়ংকর চিত্রায়ণ।

দ্য ম্যাট্রিক্স, (১৯৯৯) : এই ছবিতে দেখানো হয়েছে যে, মানুষ আসলে যন্ত্রের তৈরি এক সিমুলেটেড দুনিয়ায় বাস করছে, যেখানে যন্ত্রগুলো মানুষকে শক্তি উৎপাদনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। এটি এআই-এর চূড়ান্ত ক্ষমতা এবং মানবজাতির পরাধীনতার এক ভয়ংকর দৃশ্য তুলে ধরে।

পরিচয়ের প্রশ্ন

ব্লেড রানার সিরিজ : এই ছবিতে রেপ্লিক্যান্টস নামের কৃত্রিম প্রাণীদের দেখানো হয়েছে, যারা মানুষের মতোই দেখতে এবং অনুভব করতে পারে। তাদের মানসিক টানাপড়েন এবং পরিচয়ের সংকট মানুষের অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

চ্যাপি, (২০১৫) : এই ছবিতে চ্যাপি নামের একটি রোবটকে দেখানো হয়েছে, যে মানবীয় আবেগ ও মানবিকতা শিখতে শুরু করে। এটি রোবটের মানবিক হয়ে ওঠার এবং আত্মসচেতনতা বিকাশের প্রক্রিয়াকে তুলে ধরে।

বাস্তবতা বনাম সিনেমার এআই

সিনেমা প্রায়ই এআই-এর এমন এক ভবিষ্যৎ দেখায়, যা বাস্তবতার থেকে অনেক দূরে। সিনেমাতে দেখানো আত্মসচেতন, আবেগপ্রবণ এবং স্বাধীনচেতা এআই প্রযুক্তিগতভাবে এখনো আমাদের থেকে বহু দূরে। বর্তমানে এআই সিস্টেমগুলো মূলত ডেটা-ভিত্তিক এবং নির্দিষ্ট কাজের জন্য প্রশিক্ষিত। তারা নিজস্বভাবে চিন্তা করতে পারে না, বরং তারা যে ডেটা থেকে শিখেছে, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়।

সিনেমা যে এআই-এর বিপদ সম্পর্কে ভয় দেখায়, তার মধ্যে কিছু বিষয় অবশ্য বাস্তবতার কাছাকাছি। ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর নজরদারির মতো বিষয়গুলো আজকের এআই-এর বাস্তব সমস্যা। তবে সিনেমা কল্পনা করে যে ‘স্বাধীন’ এআই, যা মানুষের ওপর কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা প্রযুক্তিগতভাবে এখনো অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান এআই ‘চেতনা’ বা ‘আত্মসচেতনতা’ অর্জন করেনি। এআই-এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিশাল এবং একই সঙ্গে উদ্বেগজনক। আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা এজিআই (অএও)-এর ধারণা, যা মানুষের মতো বা তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হবে, এআই গবেষণার পরবর্তী লক্ষ্য। এজিআই যদি বাস্তব হয়, তবে এআই সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং এমনকি নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে সক্ষম হবে। তবে এই সম্ভাবনা কিছু গভীর নৈতিক এবং দার্শনিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। এআই যদি অনুভব করতে পারে, তাদের কি অধিকার থাকবে? যদি এআই ভুল করে, তবে তার দায়ভার কে নেবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যদি এআই নিজেদের রক্ষা করতে শেখে এবং মানবজাতির থেকে স্বাধীন হতে চায়, তাহলে কী হবে? এআই-এর দ্রুত অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে, ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যান, ইউভাল নোয়াহ হারারির মতো প্রযুক্তিবিদ এবং চিন্তাবিদরা এআই আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, এআই-এর উন্নয়নকে নৈতিক কাঠামোর মধ্যে রাখা অত্যন্ত জরুরি, যাতে এটি মানবজাতির জন্য বিপদ না হয়ে বরং কল্যাণের কারণ হয়।

নীতিনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন

এআই-এর উত্থান কিছু মৌলিক নীতিনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন তৈরি করেছে :

এআই যদি অনুভব করতে পারে, তবে ওরা কি অধিকার পাবে? যদি এআই এমনভাবে বিকশিত হয় যে তারা মানুষের মতো অনুভূতি, ব্যথা বা আনন্দ অনুভব করতে পারে, তবে তাদের কি মানুষের মতো মৌলিক অধিকার থাকা উচিত?

এআই ভুল করলে দায় কার? স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যদি দুর্ঘটনা ঘটায় বা এআই-চালিত চিকিৎসা সিস্টেম ভুল নির্ণয় করে, তবে এর দায়ভার কার ওপর বর্তাবে নির্মাতার, ব্যবহারকারীর, নাকি এআই নিজেই? কী হবে যদি এআই নিজেকে রক্ষা করতে শেখে? যদি এআই এতটাই উন্নত হয় যে, তারা নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে দেখলে আত্মরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নেয়, তখন মানবজাতির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন হবে? এআই এক নতুন সভ্যতার সূচনা করছে। এটি মানবজাতির ইতিহাসে এক বিপ্লবী পরিবর্তন নিয়ে আসছে, যা আমাদের কাজ করার, শেখার এবং বাঁচার পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে। সিনেমা আমাদের এআই-এর সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে। সেই ভয়গুলো হয়তো অমূলক নয়, কিন্তু সে ভয়ই সম্ভবত ভবিষ্যতের জন্য দরকারি প্রস্তুতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত