ছোট্ট এক কক্ষ। মেঝেতে ছেঁড়া চট। পাশে বসে আছে ২ বছরের সামিয়া, মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। কোলে ২৯ দিনের এক নবজাতক। তাকে এখনও নাম দেওয়া হয়নি। মায়ের বুকের দুধ নেই, খাবার নেই, ঘরে চাল নেই। কেবল এক বুক কান্না আর একরাশ অসহায়তা নিয়ে বসে আছেন নিশি আক্তার।
তার মুখে একটাই কথা- খেতে দিতে পারছি না, তাই কাউকে দিয়ে দেব। অন্তত বেঁচে তো থাকবে।
কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর এলাকায় একটি ভাড়া ঘরে থাকেন নিশি আক্তার কথা। বাবার বাড়ি লাকসাম উপজেলার বাতাখালী গ্রামে। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাবা প্যারালাইজড, সংসারেও অভাব লেগে আছে চিরকাল। আর স্বামী?
নিশির স্বামী ইউছুফ মিয়া, নাঙ্গলকোট উপজেলার শাকতলী গ্রামের বাসিন্দা। বিয়ের পর বেশ কয়েক বছর কেটেছে দুঃসহ নির্যাতনের মধ্যে। সামান্য কথায় মারধর করতেন, খরচ দিতেন না। শেষমেশ একদিন তিন তালাক দিয়ে সব কাগজপত্র নিয়ে চলে যান। দেননি দেনমোহরও। রেখে গেছেন কেবল ২০ হাজার টাকার ঋণ।
৭ বছর আগে জন্ম হয় রাবেয়ার। অভাবের চাপে ৯ মাস বয়সে তাকে একটি প্রবাসী পরিবারকে দিয়ে দেন নিশি। তারা এখন মেয়েটিকে নিয়ে বিদেশে থাকেন। নিশির চোখে জল—খবর পাই না... শুধু জানি, খেয়ে পরে ভালো আছে। সেটাই শান্তি।
এখন কোলে থাকা নবজাতকটিকে নিয়েও একই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তিনি। ভালো ঘরের কাউকে দেব। যে খাওয়াবে, যত্ন নেবে। আমি কিছু না পেলেও মেয়ে যেন বাঁচে।
তার ভাষায়, অভাব এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মা হয়ে সন্তানকে বুক থেকে ছাড়িয়ে দিতে চাইছেন- সে যেন দুবেলা খেয়ে পরে ভালোভাবে বাঁচতে পারে।
নিশি এখন কাজ করতে পারছেন না। শরীরও দুর্বল। জন্মের সময় অপারেশন করতে হয়েছিল—সেই খরচ তুলেছেন প্রতিবেশীরা।
ভাড়াটিয়া সেলিম মিয়া ও তার স্ত্রী নুর মহল বেগম বললেন, ওর যা অবস্থা, না খেয়ে থাকতো। তাই দেড় মাস ধরে আমাদের খাওয়া থেকেই দিচ্ছি।
তারা জানালেন, মেয়েটিকে কেউ নিতে চাইলেই নিশি দেবেন, বিনিময়ে যদি কিছু টাকা পান, তাহলে ঋণ শোধ করতে পারবেন। বাকিদের মুখেও সামান্য খাবার তুলে দিতে পারবেন।
এ বিষয়ে সদর দক্ষিণ উপজেলার নারী বিষয়ক কর্মকর্তা পারভীন আক্তার বলেন, আমরা তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করব। আইনি সহায়তার কথাও ভাবছি।
তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবাইয়া খানম জানান, নিশি শ্রীমন্তপুরের স্থায়ী বাসিন্দা নন। তাই তাকে লাকসাম উপজেলার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন।
লাকসাম ইউএনও কাউছার হামিদ বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখব। যেন নিশির পাশে দাঁড়ানো যায়।
