কিম-পুতিনের সঙ্গে বৈঠক

ক্ষমতা কার হাতে ট্রাম্পকে দেখিয়ে দিলেন শি

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৬:৩৫ পিএম

বেইজিংয়ের কেন্দ্রে চলছে সামরিক কুচকাওয়াজ। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। তারা তিনজন দাঁড়িয়ে আছেন পাশাপাশি। এই মুহূর্তটি ফ্রেম বন্দি করার জন্য নিঃসন্দেহে দারুণ সুযোগ।

একই সঙ্গে এই মুহূর্তটি শির জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্যও বটে। চীনা প্রেসিডেন্ট দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেইজিংয়ের শক্তিকে তুলে ধরতে চেষ্টা করছেন—শুধু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবেই নয়, বরং কূটনৈতিকভাবে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবেও।

ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে তখন শি গুরুত্ব দিয়েছেন চীনকে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে। কিন্তু যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনো ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পুতিনকে রাজি করাতে ব্যর্থ তখন শি প্রস্তুতি নিচ্ছেন বেইজিংয়ে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়ার জন্য।

কিমের উপস্থিতিও যেমন ছিল আকস্মিক ঘোষণা তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আবার কিম জং উনের সঙ্গে দেখা করতে চান।

বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এই স্বৈরশাসকের সঙ্গে ট্রাম্পের সবশেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কোনো সাফল্য আনতে পারেনি—যদিও দুটি শীর্ষ সম্মেলন বিশ্বের মনোযোগ কেড়েছিল। এখন তিনি আবার চেষ্টা করতে চাইছেন বলেও ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে চীনের নেতা সংকেত দিচ্ছেন যে ভূ-রাজনীতির এই খেলায় আসল কার্ড তার হাতেই থাকতে পারে এবং কিম ও পুতিন উভয়ের ওপর তার প্রভাব—যদিও সীমিত—যেকোনো চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের পর দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হয় চীন। যুদ্ধের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৩ সেপ্টেম্বর কুচকাওয়াজে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করবে বেইজিং।

কিন্তু শি এটিকে আরেকটি প্রদর্শনীতে পরিণত করেছেন। পাশাপাশি এবার সময়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অক্টোবরের শেষে এশিয়া সফর করতে পারেন এবং শির সঙ্গে বৈঠক করতে তিনি প্রস্তুত।

তাদের আলোচনার জন্য অনেক বিষয় অপেক্ষা করছে—দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শুল্ক চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের বিক্রি, কিংবা পুতিনকে যুদ্ধবিরতি বা আরও বেশি কিছুতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সম্ভাবনা।

এখানে কূটনৈতিকভাবে পুতিন ও কিমের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক—উভয় দিক থেকে শি কৌশলগতভাবে অনেক এগিয়ে। কেননা শি সবসময় আলোচনায় আছেন এবং তাকে বাদ রেখে কোনো আলোচনা হবে এমন সম্ভাবনাও থাকছে না। বরং দুই নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় শি এমন তথ্যও পেতে পারে যা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে নাও থাকতে পারে।

পশ্চিমা বিশ্বের চোখে রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া উভয়ই আজ বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র। কিম অনেক দিন ধরেই তার অস্ত্র কর্মসূচির কারণে নিন্দিত, আর পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ সেই নিন্দা আরও বাড়িয়েছে। তাই বেইজিংয়ের আমন্ত্রণ তার জন্য বড় একটি পদক্ষেপ—শেষবার কোনো উত্তর কোরীয় নেতা চীনে সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে।

২০১৯ সালের পর থেকে শি ও কিমের মধ্যে প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত—তখন তারা চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সাক্ষাৎ করেছিলেন। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনের আগে বেইজিংই ছিল কিমের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য।

সম্প্রতি মস্কো-পিয়ংইয়ং ঘনিষ্ঠতার মাঝে শি যেন আড়ালে চলে গিয়েছিলেন, যা হয়তো বেইজিং চাইছিল না।

চীন ইউক্রেন যুদ্ধে প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে, যদিও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা অভিযোগ করেছে, বেইজিং এমন কিছু উপাদান সরবরাহ করছে যা রাশিয়া যুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে।

কিছু বিশ্লেষক ভেবেছিলেন, পুতিনের সঙ্গে কিমের ঘনিষ্ঠতার কারণে হয়তো চীন-উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিমের আসন্ন বেইজিং সফর উল্টো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এটি এমন একটি সম্পর্ক যা কিম সহজে ছাড়তে পারবেন না—তার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল, প্রায় ৯০ শতাংশ খাদ্য আমদানি সেখান থেকেই আসে। আর শুধু পুতিন ও শি নয়, ইন্দোনেশিয়া, ইরান প্রভৃতি দেশের নেতাদের সঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিতি তাকে বৈধতা দিচ্ছে।

শি-এর জন্য এটি ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় একটি কূটনৈতিক হাতিয়ার, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের আগে।

দুই দেশ এখনো আলোচনায় আছে যাতে কোনো চুক্তি করে ধ্বংসাত্মক শুল্কযুদ্ধ এড়ানো যায়। আরও ৯০ দিনের জন্য বিরতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সময় দ্রুত ফুরোচ্ছে, তাই শি চাইবেন আলোচনায় সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে।

তার দেওয়ার মতো অনেক কিছুই আছে। অতীতে কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে সহায়তা করেছিলেন তিনি। আবারও কি সেটি করতে পারবেন? কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে চীন কী ভূমিকা রাখতে পারে। সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রশ্ন হলো— শি, পুতিন, কিম এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প—এই চার নেতার কি কোনো বৈঠক হতে পারে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত