৪ কর্মকর্তার কানাডায় প্রমোদভ্রমণ!

আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩১ এএম

গ্যাস সরবরাহ স্টেশন কমিশনিং, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিতাস গ্যাসের কর্মীদের জন্য এ মাসে কানাডায় দুই সপ্তাহের একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ শুরু হচ্ছে। শর্তমতে, ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রকৌশলীরাই শুধু এতে অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু প্রশিক্ষণটিতে যে সাতজন যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে অন্তত চারজনের কোনো সম্পর্কই নেই কাজটির সঙ্গে। তাদের মধ্যে আবার দুজন প্রকৌশলীই নন। তা ছাড়া দুজনের চাকরির মেয়াদ আছে তিন মাসের মতো। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ শেষে দুই মাস পরই তারা অবসরে যাবেন।

এই তালিকায় জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব, পেট্রোবাংলার পরিচালক এবং তিতাস গ্যাসের বাইরে রাষ্ট্রায়ত্ত দুই গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রয়েছেন।

শর্ত ভঙ্গ করে কারিগরি বিষয়ের মতো এমন জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণে গিয়ে ওই চারজন সেখানে কী করবেন? তাদের এই তথাকথিত প্রশিক্ষণ দেশের কোথায় কাজে লাগবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, যেসব প্রকৌশলী সরাসরি গ্যাস বিতরণে কাজ করেন, তাদের বাদ দিয়ে ক্ষমতার দাপটে ওই কর্মকর্তারা মূলত প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে প্রমোদভ্রমণ করতে যাচ্ছেন। এতে তিতাসের প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন প্রশিক্ষণের নামে অপ্রয়োজনীয় হরহামেশা বিদেশ ভ্রমণ করা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আমলাদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ বেশ পুরনো। তবে প্রশিক্ষণের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে প্রশিক্ষণ যাওয়ার মতো এমন ঘটনা নজিরবিহীন। তা ছাড়া নানা কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করেছে সরকার। অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবু বিভিন্ন অজুহাতে তাদের বিদেশ ভ্রমণ থেমে নেই।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স বাংলাদেশ এলএনজি অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ৭১৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য চুক্তি করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। এতে বেশ কিছু শর্ত রয়েছে।

প্রতিষ্ঠান দুটির মধ্যে ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর করা ওই চুক্তির শর্তে বলা আছে, রিলায়েন্স তার নিজ খরচে অন্তত আটজন প্রকৌশলীকে বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে, যারা ওই কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই প্রশিক্ষণের মেয়াদ দুই সপ্তাহের কম হবে না। গ্যাস সরবরাহের জন্য সেখানে যে রেগুলেটিং অ্যান্ড মিটারিং স্টেশন (আরএমএস) থাকবে, তা স্থাপনের পর সঠিকভাবে কমিশনিং এবং পরে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই মূলত প্রশিক্ষণটির আয়োজন করা হচ্ছে।

১৯ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর কানাডায় ওই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সাতজন কর্মকর্তার নাম চূড়ান্ত করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সরকারি আদেশ জারি করেছে। এর মধ্যে রয়েছেন জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হক, পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলে আলম, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন, তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ এবং প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক মো. হারুণ উর রশিদ এবং ব্যবস্থাপক মো. মাহফুজুল হক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিতাসের তিন কর্মকর্তা ছাড়া কারোরই ওই কাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া জিয়াউল হক এবং জাকির হোসেন কোনো প্রকৌশলীই নন।

জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. জিয়াউল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মূলত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক পেট্রোবাংলার প্রতিনিধি হিসেবে যাচ্ছেন। পেট্রোবাংলার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় আমাকে সুপারিশ করেছে।’

প্রকৌশলী না হয়ে এবং কাজের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও কীভাবে এই প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন, এটি কি প্রশিক্ষণের শর্ত লঙ্ঘন হচ্ছে না এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে তিনি বলেন, অতিরিক্ত সচিব ছাড়াও আমি পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং আরেকটি কোম্পানির পরিচালক।’

রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা পদাধিকার বলে সাময়িক দায়িত্ব পালন করেন। তাদের বোর্ড মিটিং করা ছাড়া সরাসরি কারিগরি কাজের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। তা ছাড়া একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে ওই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের থাকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি চলে আসছে। এটি স্বার্থের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয় বলেও বিভিন্ন সময় প্রমাণ হয়েছে। সেই পরিেেপ্রক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের অনেক প্রতিষ্ঠানে একই বিভাগের কর্মকর্তাদের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (চলতি দায়িত্ব) এই প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন, যিনি মূলত পেট্রোবাংলারই কর্মকর্তা। সম্প্রতি তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয় চলতি দায়িত্ব হিসেবে। তার চাকরির মেয়াদ আর মাস তিনেক রয়েছে। প্রায় একই সঙ্গে অবসরে যাবেন বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

প্রকৌশলী না হয়ে এবং ওই কাজের সঙ্গেও কোনো সম্পর্ক না থাকার পরও কীভাবে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন, তা জানতে চাইলে গতকাল জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আপনি তিতাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই ফোনের সংযোগটিও কেটে দেন।

পরে অবশ্য তিনি রাতে আবার ফোন দিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণে যাওয়ার জন্য আমি কোনো তদবির করিনি। কে, কীভাবে নাম দিল তাও জানি না। তবে তালিকায় নাম দেখার পর ভাবলাম সারাজীবন সততার সঙ্গে চলেছি, সে জন্য হয়তো চাকরির শেষ সময়ে এটি আমার একটা বড় উপহার। কিন্তু এখন যেহেতু আপনারা সমালোচনা করছেন, আমি আমার নাম প্রত্যাহারের জন্য আজই (গতকাল) চেয়ারম্যান স্যারের কাছে চিঠি পাঠাব।’

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজকে ফোন দেওয়া হলে তার কোনো সাড়া না পাওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

সরকারের বিদেশ ভ্রমণ নীতিমালায় বলা হয়েছে, বিদেশে প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে জুনিয়র বা কনিষ্ঠ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাধান্য দিতে হবে। এ ছাড়া বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই এমন কাউকে পাঠানো যাবে না।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিতাসের অন্তত আটজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে একমাত্র তিতাস গ্যাস সরবরাহ করবে। সে জন্য চুক্তির শর্তে এই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে অন্য প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকদেরও তো কাজ নেই। তা ছাড়া তাদের অনেকে তো প্রকৌশলীই নন। তারা সেখানে গিয়ে কী করবেন?

কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ ধরনের বড় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহের জন্য নির্মিত রেগুলেটিং অ্যান্ড মিটারিং স্টেশনটির ক্যাপাসিটিও সবচেয়ে বেশি (১৬০ এমএমএসসিএফডি)। স্থাপিত এই বৃহৎ আরএমএস/গ্যাস স্টেশন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবল খুবই জরুরি। কারণ চুক্তি অনুযায়ী আরএমএস/গ্যাস স্টেশন ‘পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’-সংক্রান্ত কাজের জন্য গ্যাস সরবরাহ একাধারে ৩০ ঘণ্টা বা বছরে ৯৬ ঘণ্টার বেশি বন্ধ থাকলে তিতাস গ্যাসকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত