ভুয়া পরিচয় দিয়ে সিঙ্গাপুর প্রবেশের দিন শেষ, আসছে এনবিডি ব্যবস্থা

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩২ এএম

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে প্রবেশের চেষ্টা করা প্রায় ৪১ হাজার ৮০০ বিদেশি নাগরিককে চেকপয়েন্টে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকে এই প্রবেশনিষিদ্ধ ব্যক্তিদের জন্য আরও কঠোর নিয়ম চালু হচ্ছে। নতুন উদ্যোগের নাম ‘নো-বোর্ডিং ডিরেকটিভ’ (এনবিডি), যা ২০২৬ সালের শুরু থেকেই কার্যকর হবে।

জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এয়ারলাইন্সগুলো- যেমন সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, স্কুট, এমিরেটস, তুর্কিশ এয়ারলাইন্স এবং এয়ারএশিয়া- এই এনবিডি ব্যবস্থা প্রয়োগ করবে। যার ফলে সিঙ্গাপুরে প্রবেশের জন্য অযোগ্য ব্যক্তিদের ফ্লাইটে ওঠা বাধা দেওয়া হবে। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড চেকপয়েন্টস অথরিটি (আইসিএ) জানিয়েছে, আগামী মার্চ থেকে আরও অনেক এয়ারলাইন্স এই ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।

আইসিএর পরিসংখ্যান নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে। জানুয়ারি–নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বাধাপ্রাপ্ত যাত্রী সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি এবং ২০২৩ সালের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইসিএ বলেছে, নতুন ক্লিয়ারেন্স কনসেপ্টের কারণে অনেক যাত্রীকে সময়মতো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এতে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত, যেমন জালিয়াতি শনাক্তকরণ সক্ষম অটোমেটেড লেন এবং মাল্টি-মোডাল বায়োমেট্রিক স্ক্রিনিং। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একাধিক পরিচয় ব্যবহারকারী বা অন্যের ছদ্মবেশে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করা যায়। সেই সঙ্গে অপরাধী ও নিষিদ্ধ ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব।

আইসিএর ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার (ডিএসি) জো ট্যান বলেন, ‘আমরা অগ্রিম যাত্রী তথ্য ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে চেকপয়েন্টে পৌঁছানোর আগে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের শনাক্ত করি। তারপর তাদের আরও কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষা দিতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীকে আগেই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাই আমরা সরাসরি প্রবেশে বাধা দিই না। আগমনের সময় অটোমেটেড লেনে তাদের থামিয়ে আরও পরীক্ষা করা হয়।’ তদন্তকারী কর্মকর্তারা সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাত্রীর উদ্দেশ্য ও প্রবেশের যোগ্যতা নির্ধারণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে অনুরূপ ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চালু আছে। সেখানে এয়ারলাইন্সের সঙ্গে সমন্বয় করে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠা রোধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে সিকিউর ফ্লাইট প্রোগ্রামের মাধ্যমে এফবিআই পরিচালিত ওয়াচলিস্টের সঙ্গে যাত্রী তথ্য রিয়েল টাইমে যাচাই করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স পরিচালিত মুভমেন্ট অ্যালার্ট লিস্টে গুরুতর অপরাধী বা নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।

সিঙ্গাপুরও একই ধরনের সক্ষমতা ব্যবহার করে অবাঞ্ছিত যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠা রোধ করতে চায়। ধাপে ধাপে এনবিডি কার্যকর করা হবে এবং পরিচিত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ, নিষিদ্ধ বা অবাঞ্ছিত বিদেশিদের সিঙ্গাপুরগামী ফ্লাইটে ওঠা বাধাপ্রাপ্ত হবে।

আইসিএর অপারেশনস ডিভিশনের ডেপুটি ডিরেক্টর ডিএসি ট্যান জানান, ২০২২ সাল থেকে এয়ারলাইন অপারেটরদের সঙ্গে একাধিক আলোচনা শেষে এনবিডি চালু হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এয়ারলাইন্সগুলো পাসপোর্টের বায়োডেটা পৃষ্ঠা ও সহায়ক নথি চাক্ষুষ পরীক্ষা করে যাচাই করে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং সিঙ্গাপুরের বৈধ ভিসা আছে কি না বা আগমন কার্ড জমা দেওয়া হয়েছে কি না—তারও যাচাই সঠিকভাবে হয় না।

এনবিডি কার্যকর হলে, যাত্রীদের অগ্রিম তথ্য আইসিএর সিস্টেমে স্ক্রিন করা হবে। এরপর এয়ারলাইন্সগুলোকে বোর্ডিং নির্দেশ দেওয়া হবে। প্রবেশের অযোগ্য যাত্রীদের এনবিডি নোটিশ দেওয়া হবে এবং চেক-ইন করার সময় বোর্ডিংয়ে বাধা দেওয়া হবে।

ডিএসি ট্যান জোর দিয়ে বলেন, আইসিএ সম্পূর্ণ নিশ্চিত হওয়ার পরই যাত্রীকে সিঙ্গাপুরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। এনবিডি প্রাপ্ত যাত্রীরা যদি প্রবেশ করতে চান, তবে নতুন ফ্লাইটের আগে আইসিএর অনুমোদন নিতে হবে।

বর্তমানে আইসিএ অনেকটা ম্যানুয়ালভাবে অবাঞ্ছিত যাত্রী শনাক্ত করে। এসজিটি৩ মুহাম্মদ ইউসরি করিম বলেন, আগে ম্যানুয়াল কাউন্টারে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স ও প্রোফাইলিং দুটোই করতে হতো। উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী শনাক্ত করে সঙ্গে সঙ্গে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। লম্বা লাইন ও ক্লান্তি দেখে চাপ অনুভূত হত।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে অটোমেটেড ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স লেনে পাসপোর্ট-লেস ক্লিয়ারেন্স চালু হওয়ার পর স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়েছে। ইউসরি বলেন, আইরিস ও ফেসিয়াল বায়োমেট্রিক্স ব্যবহার করে ক্লিয়ারেন্সে সময় অনেক কম লাগে। আমরা নিরাপদ ও দক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক যাত্রী ক্লিয়ার করতে পারি।

এনবিডি বায়ু ও সমুদ্র চেকপয়েন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কারণ সেখানে বোর্ডিং টিকিট প্রয়োজন। তবে স্থল চেকপয়েন্টে এর প্রভাব কম হবে। ডিএসি ট্যান জানান, স্থল চেকপয়েন্টে বিদেশিদের আগমন কার্ড জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে, তাই তাদের তথ্য আমাদের কাছে থাকবে। এনবিডির মূল লক্ষ্য হলো ফ্লাইটে অযোগ্য যাত্রীদের ওঠা রোধ করা। স্থলপথে আসা যাত্রীদের থামানোর ক্ষমতা এতে কমবে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত