সাম্য ও মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন— ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ কবির এই চরণ যেন বাস্তব রূপ নিয়েছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়িতে। শত বছরের বেশি সময় ধরে এখানে একই স্থানে পাশাপাশি অবস্থিত কবরস্থান ও শ্মশান ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি ইউনিয়নের আঠারবাড়ি-নান্দাইল সড়কসংলগ্ন আঠারবাড়ি গ্রামে যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের কবরস্থান এবং হিন্দুদের মহাশ্মশান একই স্থানে অবস্থান করছে। দুই ধর্মের মানুষের শেষ ঠিকানা এখানে হলেও কখনোই তা বিভেদ বা বিরোধের কারণ হয়নি; বরং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানান, জমিদার আমল থেকেই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এখানে মুসলমানদের দাফন এবং হিন্দুদের দাহকর্ম ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে আসছে। এলাকার হিন্দু ও মুসলমানরা যেমন একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করেন, তেমনি নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসবও পালন করেন সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কেউ কাউকে বাধা দেয় না; বরং পারস্পরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে রয়েছে গভীর গর্ববোধ।
স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা জানান, প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গা নিয়ে আঠারবাড়ি কবরস্থানটি গড়ে উঠেছে, যা ইউনিয়নের একমাত্র সরকারি কবরস্থান। ধারণা করা হয়, এর সূচনালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত এখানে আনুমানিক ৫ শতাধিক মুসলমানকে দাফন করা হয়েছে। শতবর্ষী এই কবরস্থান সংরক্ষণে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগ কামনা করেছেন এলাকাবাসী।
অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মাবলম্বী স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ২৬ শতাংশ জায়গাজুড়ে আঠারবাড়ি মহাশ্মশান অবস্থিত। এ মহাশ্মশানে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৬ শতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বীর দাহ বা পঞ্চতত্ত্বে বিলীন হওয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
ইসলাম ধর্মাবলম্বী স্থানীয় পাঁচবারের সাবেক ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান ও আঠারবাড়ি ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আরিফ হাসান বলেন, ‘শত বছর ধরে এখানে মুসলমানদের দাফন ও হিন্দুদের সৎকার হয়ে আসছে। এ নিয়ে কখনো কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। সবাই নিজ নিজ ধর্মীয় বিধান মেনেই কাজ সম্পন্ন করে। আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করছি এবং তাদের ধর্মীয় উৎসব পালনে সহযোগিতা করে থাকি।’
আঠারবাড়ি মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুদর্শন বণিক বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা একই স্থানে কবরস্থান ও শ্মশান স্থাপন করে গেছেন। দুই ধর্মের মানুষ নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী এখানে দাফন ও সৎকার সম্পন্ন করছে। কখনো কোনো ধর্মীয় সমস্যা হয়নি। এটি আমাদের এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল নিদর্শন।’
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, ‘শুনেছি আঠারবাড়ি ইউনিয়নে যুগ যুগ ধরে একই স্থানে পাশাপাশি কবরস্থানে দাফন ও মহাশ্মশানে সৎকার হয়ে আসছে। এখানে সনাতন ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি অনন্য উদাহরণ। সুযোগ পেলে জায়গাটি পরিদর্শন করব এবং কবরস্থান ও মহাশ্মশানের উন্নয়নমূলক কাজে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।’
