তফশিলের পর ৩৬ দিনে ১৫ প্রাণহানি, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে টিআইবির শঙ্কা

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২০ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সহিংসতা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, তফশিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনের মধ্যেই অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে টিআইবির কনফারেন্স রুমে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় সহিংসতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হেনস্থা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো একাধিক ঘাটতি স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে। ও সময়ে এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং ৫০টির বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় নির্বাচনি পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত মোট জনবলের মধ্যে মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য থাকায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংশয় ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো কয়েকটি দল ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত হওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছে।

নির্বাচনি কাঠামোগত নানা সমস্যার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ৪৬টি সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইলেকশন কমিশন কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার মধ্যেও বেশ কয়েকটির সক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। টিআইবির মতে, এসব সংস্থার অনেকগুলোই কার্যত ‘নামসর্বস্ব’, যা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে। হলফনামায় দাখিল করা তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা ও কার্যকর ব্যবহার নিয়েও ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কমিশনের কঠোর অবস্থানের অভাবে আচরণবিধি বাস্তবায়নে দুর্বলতা থেকে যাচ্ছে।

সবশেষে প্রতিবেদনে নির্বাচন ও গণভোট—উভয় ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়াগত বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর সম্ভাবনাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নানা প্রতিকূলতা ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ কিছুটা সক্রিয় রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত