অতীতে নির্বাচনে পুলিশকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই কালিমামুক্ত হতে জাতিকে একটি অর্থবহ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। এছাড়া ঢাকা মহানগর এলাকায় ৩৭টি ভোট কেন্দ্র ঝুকিপূর্ণ বলেও জানান তিনি।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১২টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এই কথা বলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ঢাকা মহানগন পুলিশের নেওয়া নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, নানা কারণে এবাবের নির্বাচন আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে নির্বাচনে পুলিশকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই কালিমামুক্ত হতে জাতিকে একটি অর্থবহ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেই ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে দেশ একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ধারপ্রান্তে উপস্থিত হয়েছে তা এগিয়ে নিতে আমরা ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।
নাগরিকদের কাছে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এই নির্বাচনে আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবো যা ভবিষ্যতের জন্য অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
রাজধানীতে নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, এবছর ঢাকা মহানগর এলাকায় ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, ভোটার সংখ্যা ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে ভোট কেন্দ্রগুলোকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ৬১৪টি ভোট কেন্দ্রে চারজন করে এবং সাধারণ ৫১৭টি ভোটকেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়া আমরা আরও ৩৭টি ভোটকেন্দ্র ঝুকিপূর্ণ মনে করে চিহ্নিত করেছি। এই ৩৭টি কেন্দ্র সাতজন করে পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবে। ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি জানার জন্য একজনের কাছে থাকবে বডি অন ক্যামেরা। একাধিক ভোট কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকবে ১৮০টি স্টাইকিং টিম ও ৫১০টি মোবাইল টিম। এছাড়া টাকা মহানগরের আট বিভাগে আটটি কন্ট্রোল রুম এবং চারটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম থাকবে। সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন থাকবে স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্স। উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা এসব ফোর্স বেছে বেছে মোতায়েন করা হবে। এছাড়া সোয়াত, বোম্ব ডিসপোজ টিম, ক্রাইম সিন ভ্যান ও অশ্বারোহী পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আপনারা নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে এসে সুশৃঙ্খলভাবে আপনাদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করুন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক এই মাহেন্দ্রক্ষণে সকলে সম্মিলিত অবদান রাখি।
সেনাবাহিনীর তথ্যমতে ঢাকায় দুইটি আসন ঝুঁকিপূর্ণ, ডিএমপির মতে কয়টি আসন ঝুঁকিপূর্ণ জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমরা সেভাবে এনালাইসিস করিনি। আমরা এনালাইসিস করেছি, ঢাকা মেট্রোপলিটনে দুই ধরনের কেন্দ্র থাকবে। একটি হলো গুরুত্বপূর্ণ, আরেকটি হলো সাধারণ। ১ হাজার ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং ৫১৭টি সাধারণ ভোটকেন্দ্র। এছাড়া আমরা ৩৭টি ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করেছি, যেখানে ৭ জন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
নির্বাচন ঘিরে সোয়াত প্রস্তুত রাখাসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ডিএমপি। নির্বাচন ঘিরে কি ধরনের নিরাপত্তার থ্রেট রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো থ্রেট নেই। পরিবেশ দেখছেন না। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভালো পরিবেশ চলছে। অপরাধ নেই, আইনশঙ্খলার সমস্যা নেই, রাস্তাঘাট অবরোধ নেই। খুবই ভালো পরিবেশ। তিন কোটি লোকের শহরে আমরা পুলিশিং করি। যেখানে বেকারত্ব আছে, ভাসমান লোক আছে, নানা ধরনের সমস্যা আছে। এমন একটি শহরের আইনশৃঙ্খলা, অপরাধ পরিস্থিত চমৎকার রয়েছে।
নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া আছে। একটি নির্বাচন যখন হয়, তখন একটি দল জয়লাভ করে, একটি দল পরাজয় লাভ করে। তখন পরাজিতরা কারচুপির কথা বলে। আমাদের দেশের কালচারই এমন। এখনো বাজারে নানা গুজব রয়েছে।
নির্বাচন সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় ডিএমপি কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরাদের সার্বিক যে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সেখানে সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমার কলিগ সবাই আছে। তিন কোটি ঢাকাবাসী এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে। কারো নিরাপত্তাহানি ঘটবে আমরা মনে করি না। শঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, আমি শতভাগ নিশ্চিত করছি।
অতীতে পুলিশকে রাজনৈতিক দল ব্যবহার করেছে। এবার কি কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে যে পুলিশকে রাজনৈতিক দল ব্যবহার করতে পারবে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত ১৫ মাস আমি ডিএমপির কমিশনার। আপনারা কি দেখেছে, আমরা রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেছি। যদি দেখেন আমরা কোনো দলের পক্ষে কাজ করিনি, তাহলে এটাই প্রমাণ করে আমরা কোনো দলের না।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিএমপি কমিশনারের লাঠি হাতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ছুটির দিনে বাসায় ইনফরমাল ড্রেসে চুল কাটাচ্ছিলাম। যখন শুনতে পেলাম আন্দোলনকারীরা যমুনায় ঢুকে পড়ছে, আমি অন্য কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই চলে এসেছি। গিয়ে দেখি পরিস্থিতি ভয়ানক। নির্বাচনের ৫-৬ দিন আগে সরকার প্রধানের বাসার সামনে আন্দোলনকারীরা এসে যদি এ ধরনের কর্মকান্ড করে, তাহলে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে কি বসে থাকার সুযোগ আছে? ডেইলি স্টার-প্রথম আলোতে যে আক্রমণ হলো গভীর রাতে, ট্রাফিক জ্যামের কারণে আমার অফিসারদের আমি সময়মতো সেখানে পাঠাতে পারিনি। এই ধরনের ঘটনা ঘটলো। তখন সব দায় পুলিশর ওপর এলো। সরকার প্রধানের বাসভবনে যখন আন্দোলনকারীরা ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে আমার বসে থাকার সুযোগ আছে কিনা?
