ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সোনাদিয়া ও বুড়ির চর ইউনিয়নের বিভিন্ন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধোরের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও থানায় অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
এ ব্যাপারে রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে হাতিয়া থানায় দুটি অভিযোগ দাখিল করা হয়। এর আগে রবিবার বিকেলে হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রিয়াজ মার্কেট এলাকায় এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী নারী-পুরুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতায় তাদের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ভোটের দিন থেকে শুরু করে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরবর্তী সময় পর্যন্ত সোনাদিয়া বাংলাবাজার ও রিয়াজ মার্কেট এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে এনসিপির সমর্থকরা ভয়ভীতি ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ফল ঘোষণার পর অন্তত ১০টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। ঘরের ভেতরে ঢুকে গালিগালাজ, লুটপাট এবং গবাদিপশুর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এমনকি ভোট শেষ হওয়ার তিন দিন পরও ভুক্তভোগীদের যেখানেই পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেই মারধর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
বক্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তারা নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী দীপক চন্দ্র দাস বলেন, এনসিপির লোকজন ভোটের পরদিন রাতে বাংলা বাজারে আমাকে ও আমার ছেলেকে মারধর করে। তারা বলে, আগে আওয়ামী লীগ করছ, এখন ধানের শীষে ভোট দিয়েছ কেন।
দুর্জয় ধন দাসের স্ত্রী অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা তাদের গবাদিপশু পিটিয়ে আহত করে এবং বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেয়।
কাকন চন্দ্র দাস জানান, তাকে বাজারে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে পকেট থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়। একাধিক ভুক্তভোগী নারী বলেন, এনসিপির বিজয় মিছিলের সময় বাড়িতে ঢুকে পুরুষদের টেনে নেওয়ার চেষ্টা, মারধর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। অনেকে প্রাণভয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব ঘটনায় স্থানীয় এনায়েত হোসেন, মহিউদ্দিন, হান্নান ডুবাই, ওছমান ও জহিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র জড়িত। তাদের সহযোগী হিসেবে স্থানীয় নাইম, কাওছার, জুয়েল, শাকিব, শুভ, হাসান, সম্পদ, নিশান ও জিটনের নামও উল্লেখ করেন তারা।
এদিকে বুড়িরচর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে গৌরহরি মাঝি বাড়ির মৃদুল চন্দ্র দাসের ঘরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মৃদুল চন্দ্র দাস জানান, তার ঘরে হামলা ও ভাঙচুরের বিষয়ে নৌবাহিনীর সদস্যদের কাছে অভিযোগ জানালেও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মৃদুল চন্দ্র দাস ও তার স্ত্রী বলেন, ভোটের দিন একদল অস্ত্রধারী লোক হঠাৎ তার ঘরের সামনে এসে বলে, তোদের ঘরে ধানের শীষের লোক আছে। এরপর ঘরের চারদিকে রামদা দিয়ে কোপাতে থাকে। সন্ত্রাসীরা লাথি দিয়ে ঘরের দরজা ভেঙে ফেলেন। আমাদের বিয়ের উপযুক্ত তিনটি মেয়ে থাকায় তাদের রেখে আমরা ঘর ছেড়ে যেতে পারিনি।
প্রত্যক্ষদর্শী পল্লী চিকিৎসক খনেশ দাস বলেন, চারু বালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রটি তাদের ঘরের পাশে হওয়ায় হামলাকারীরা দ্রুত বাড়িতে ঢুকে পড়ে। ওরা আমাকে অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দিয়েছিল। প্রশাসন চাইলে কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা দেখে অপরাধীদেরকে শনাক্ত করতে পারবে। আমি এখনো তাদের ভয়ে হাটেবাজারে যেতে পারছি না।
এ বিষয়ে হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। ঘটনাস্থলগুলোতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
