বিশ্ব চলচ্চিত্রের আরেকটি মর্যাদাসম্পন্ন সম্মাননা ‘ব্রিটিশ একাডেমি চলচ্চিত্র পুরস্কার (বাফটা)। প্রতিবছরই চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য বিশিষ্টজনদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। গত রবিবার রাতে লন্ডনের রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলে এই বিতরণীর আয়োজন করা হয়। এবারের ৭৯তম বাফটার আসরেও বাজিমাত করল অস্কারজয়ী অভিনেতা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অভিনীত ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। গত বছর জুড়ে আলোচিত ও ব্যবসায়িক দিক দিয়ে শীর্ষে থাকা এই সিনেমাটি এরই মধ্যে গোল্ডেন গ্লোবসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা সিনেমার স্বীকৃতি পেয়েছে। সিনেমাটি অনেকগুলো ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতলেও অভিনেতা ডিক্যাপ্রিও এখন পর্যন্ত কোনো শাখার স্বীকৃতি পাননি। তবে ছবিটি বছরের সেরা চলচ্চিত্রসহ ছয়টি পুরস্কার জিতে আসরের শীর্ষ বিজয়ী হয়েছে। পল থমাস অ্যান্ডারসন পরিচালিত ছবিটি সেরা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সেরা পরিচালক, রূপান্তরিত চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ ও সম্পাদনার পুরস্কারও গেছে এই ছবির ঝুলিতে। সিনেমাটি যুদ্ধ-পরবর্তী মানবিক টানাপড়েনকে যেভাবে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছে, তা সমালোচক ও দর্শক দুই পক্ষেরই মন জয় করেছে।
সহ-অভিনেতা বিভাগে একই ছবির জন্য পুরস্কার পেয়েছেন শন পেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য বিতর্ক ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেতার কাছে এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। এ বছরের বাফটার আরেক বড় আকর্ষণ ‘সিনার্স’। রায়ান কুগলার পরিচালিত ছবিটি জিতেছে তিনটি বড় পুরস্কার সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য, পার্শ্ব অভিনেত্রী ও মৌলিক সংগীত। এই জয়ের মধ্য দিয়ে কুগলার বাফটার ইতিহাসে মৌলিক চিত্রনাট্য বিভাগে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বিজয়ী হিসেবে নাম লেখালেন। পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে সম্মান পেয়েছেন উনমি মোসাকু আর সংগীতে জাদু দেখিয়ে পুরস্কার ঘরে তুলেছেন লুডভিগ গোরানসন।
সেরা অভিনেতা বিভাগে এবারের ফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। টিমোথি শ্যালমে বা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও নন, ‘আই সয়্যার’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেতা হয়েছেন রবার্ট অ্যারামায়ো। তরুণ এই অভিনেতার এই অর্জন অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। অনুমিতভাবেই ‘হ্যামনেট’ সিনেমার জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন জেসি বাকলি। একই সঙ্গে ‘হ্যামনেট’ সেরা ব্রিটিশ ছবির পুরস্কারও জিতে নিয়েছে। সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে নরওয়ের ইয়োকিম ট্রিয়ারের ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’। মানবিক গল্প বলার শক্তি যে কত গভীর, তার প্রমাণ মিলেছে এই ছবিতে।
সেরা প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার গেছে ‘মিস্টার নোবডি এগেইনস্ট পুতিন’। রাজনৈতিক পটভূমিতে ব্যক্তির অবস্থান এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি সমসাময়িক বাস্তবতার এক তীক্ষè প্রতিফলন। অ্যানিমেশন বিভাগে জয় পেয়েছে ‘জুটোপিয়া ২’, আর শিশু ও পারিবারিক চলচ্চিত্র বিভাগে সম্মানিত হয়েছে ‘বুং’।
কারিগরি বিভাগে নজর কেড়েছে গিয়ের্মো দেল তোরের ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। প্রোডাকশন ডিজাইন, মেকআপ ও কস্টিউম ডিজাইনে তাদের সৃজনশীলতা আলাদা করে প্রশংসিত হয়েছে। ভিজ্যুয়াল এফেক্টসে পুরস্কার জিতেছে জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার : ফায়ার অ্যান্ড অ্যাশ’। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অ্যালান কামিং। তার রসবোধে ভরপুর উপস্থাপনায় একদিকে যেমন হাসির রোল উঠেছে, অন্যদিকে শিল্পীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে সময়ের রাজনৈতিক উত্তাপ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈচিত্র্যের প্রশ্ন।
বাফটায় ভারতীয় ঝলক
বাফটার এবারের আসরে বড় একটা নজির স্থাপন করল ভারত তথা বলিউডের সিনেমা ও কলাকুশলীরা। গত নভেম্বরেই অমৃতলোকে পাড়ি দিয়েছেন ‘হি-ম্যান’খ্যাত বলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। স্মৃতিতে আজও তার উজ্জ্বল উপস্থিতি। শুধু দেশের মাটিতে নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ‘বীরু’র শূন্যতা যেন একই ধরনের। লন্ডনের মাটিতে ‘বাফটা’র মঞ্চে ধর্মেন্দ্রকে স্মরণ করা দেখে দেখে চোখে জল আসে অনুরাগীদের। পাশাপাশি ছিল লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী পরিচালিত আঞ্চলিক ভারতীয় ছবির জয়জয়কার। বাফটার মঞ্চে সস্ত্রীক ফারহান আখতার, লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী এবং রীতেশ সিধওয়ানি উপস্থিত ছিলেন। সবাই মিলে ট্রফি নেন। ‘বেস্ট চিলড্রেনস অ্যান্ড ফ্যামিলি ফিল্ম’ বিভাগে মনোনীত হয়েছিল ‘আর্কো’, ‘লিলো অ্যান্ড স্টিচ’, ‘জুট্রোপলিস ২’-এর মতো হলিউডের মেগা বাজেটের ছবি। সব সিনেমাকে পেছনে ফেলে দিয়ে বাজিমাত করে নতুন ইতিহাস গড়ল ভারতের ‘বুং’ সিনেমাটি। কাকতালীয়ভাবে ওই দিনই ছিল ফারহান আখতারের চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী। বাফটার মঞ্চে এমন নিজেদের সিনেমার জয় তার বিবাহবার্ষিকী আরও মধুময় ও রঙিন হয়ে ওঠে। তবে মেট গালার লাল গালিচা, কানের মঞ্চ কাঁপিয়ে এবার ‘বাফটা’য় নিজেকে প্রমাণ করলেন বলিউডের লাস্যময়ী অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের নজরকাড়া উপস্থিতি। ভারতীয় স্টাইলে উপস্থিত হলেও তার মুখের একটানা হিন্দি ভাষা শোরগোল ফেলে দেয় বাফটার মঞ্চে। চারদিকে হলিউডের তাবড় তাবড় অভিনেতার ভিড়ের মধ্যেও নজর কাড়লেন উপস্থাপক আলিয়া। শরীরে স্পষ্ট আত্মবিশ্বাসের ছাপ। মুখে হিন্দি ভাষা। ‘বাফটা’র অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। ওই ভিডিওটিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, হিন্দিতে ‘নমস্কার’ বলে উপস্থাপনা শুরু করলেন আলিয়া। তিনি গড়গড় করে বললেন, ‘আগলা অ্যাওয়ার্ড এক অ্যাইসি ফিল্ম কে লিয়ে হ্যায়, জো আংরেজি মে নাহি হে।’ যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘এবারের পুরস্কার এমন একটি ছবি জিতেছে, যেটি ইংরেজিতে তৈরি নয়।’ এরপর অবশ্য তিনি ইংরেজিতেও বক্তব্য দেন। নিজের মাতৃভাষার প্রতি আলিয়ার আবেগে মুগ্ধ অনুরাগীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাই নিমেষে ভাইরাল ভিডিওটি। সবাই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ‘বাফটা’র মঞ্চে গুচির পোশাকে তাক লাগালেন আলিয়া। রূপালি সিকুইন্সের হল্টার নেক গাউনে অনবদ্য কাপুরবধূ। সঙ্গে সাদা লোমশ স্টোল। সব মিলিয়ে যেন অনন্য ছিল রণবীর ঘরনি। কোনো কোনো হলিউড, বলিউড তারকা তার অনুপ্রেরণা, তা স্পষ্ট করেন আলিয়া।
তিনি জানান, কেশসজ্জার জন্য ফরাসি অভিনেত্রী ব্রিগিট বার্ডট, ইতালীয় মডেল-অভিনেত্রী মণিকা বেলুচির শরীরী ভঙ্গিমা এবং সৌন্দর্যের নিরিখে রেখার গুণমুগ্ধ তিনি। নিজের ছোট্ট মেয়ে রাহাই যে তার আসল অনুপ্রেরণা, তাও জানান আবেগঘন তারকা।
তিনি বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি যেন অ্যাকশন শুনেই আমার জন্ম। ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারা আমার কাছে বড় আশীর্বাদ। অভিনয় জগতে আসতে পেরে আমি ধন্য। তবে সত্যি আমার আসল অনুপ্রেরণা ছোট্ট রাহা। একেবারে ফুলের মতো। সবে তিন বছর বয়স। কী সুন্দর আমার গানে নাচে। আমি যেন নিজেকে দেখতে পাই।’