আড়াল ছেড়ে প্রকাশ্য আলিঙ্গন

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫০ এএম

প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই ভারত ও ইসরায়েল এখন ঘনিষ্ঠ মিত্র। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরায়েল যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৭ সালের সফরের ৯ বছর পর এটি তার দ্বিতীয় ইসরায়েল যাত্রা। তার এই সফরের আগে প্রশ্ন উঠেছে, নয়াদিল্লি-তেল আবিবের এই বন্ধুত্বের সমান্তরালে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি ভারতের সমর্থন ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে কি না? কেননা মোদির এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন পশ্চিম তীরের দখলদারিত্ব নিয়ে ভারতের অবস্থান কিছুটা অস্পষ্ট এবং গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের মুখে গ্লোবাল সাউথের খুব কম নেতাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দেখা করেছেন। এদিকে, মোদির আসন্ন ইসরায়েল সফর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও টানাপড়েন তৈরি করেছে। সফরে মোদির দেশটির পার্লামেন্টে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী এতে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা। কিন্তু তা নিয়ে দোলাচল তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পার্লামেন্টে মোদির ভাষণে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানো না হলে তা বর্জনের হুমকি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ।

তবে ভারত-ইসরায়েলের এখনকার এই দহরম মহরমের গল্পের অতীত ভিন্ন কথা বলে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা ভারত, ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিল। ১৯৩৮ সালে মহাত্মা গান্ধী লিখেছিলেন ইংল্যান্ড যেমন ইংরেজদের, ফিলিস্তিনও তেমনই আরবদের। ১৯৪৮ সালে ভারত ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভোট দেয়। ১৯৫০ সালে ভারত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেনি। এমনকি পরের ৪ দশক ধরে ভারতীয় পাসপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৯৬২-র চীন যুদ্ধ এবং ১৯৬৫-র পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, ইসরায়েল ভারতকে গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করে। বিনিময়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক স্বীকৃতি চাইলেও ইন্দিরা গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। উল্টো ১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম অনারব দেশ হিসেবে পিএলও-কে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৯০-এর দশক ভারত-ইসরায়েলের শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি হয় ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর। এর পরের বছর পি ভি নরসিমা রাও ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধে ইসরায়েল ভারতকে লেজার-গাইডেড বোমা দিয়ে বড় সহায়তা করে। এরপর থেকেই তলে তলে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বাঁকবদল ঘটে। তবে ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর হঠকারিতা ঝেড়ে ফেলে ভারত ইসরায়েলকে খোলাখুলি আলিঙ্গন করে। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন।

কৌশলগত ভারসাম্য না নতুন অক্ষ

ভারত দাপ্তরিকভাবে এখনো ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস এই সফরকে ‘ভণ্ডামি’ বলে অভিহিত করে বলেছে প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভোটে ভারত ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবে ভারত ভোট দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মোদি এক বিশেষ ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রাখছেন। একদিকে তিনি ইসরায়েলের কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি ও অস্ত্র নিচ্ছেন, অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি ও শ্রমবাজারের স্বার্থ রক্ষা করছেন।

ইসরায়েলে টানাপড়েন

মোদির তেল আবিব সফর নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিতে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। সফরে মোদির ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’এ ভাষণ দেওয়ার এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে। তবে বিরোধীরা বলছে, পার্লামেন্টে মোদির ভাষণে প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানানো না হলে তা বর্জন করা হবে। বিরোধীদলীয় নেতা লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, মোদির ভাষণের সময় সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক অমিতকেও নেসেটে আমন্ত্রণ জানাতে হবে। বিরোধীদের দাবি এটি বর্জনের ডাক নয়, বরং সরকার ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের একটি বিব্রতকর পরিস্থিতির’ দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। লাপিদ জোর দিয়ে বলেন, আমরা চাই না আমাদের কারণে ভারত বিব্রত হোক। একশ কোটি মানুষের একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন, আর নেসেট অর্ধেক খালি থাকবে, এমনটি হতে পারে না। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে। এই বিষয়টি দুই বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির জনগণকে স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত