ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈরিতা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার মধ্য দিয়ে তেহরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হয় ওয়াশিংটন। পরবর্তী সময়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যেতে থাকেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশটিতে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলার অজুহাত খুঁজছিল। আর সে আগুনে ঘি ঢেলে তা উসকে দিচ্ছিল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং একটি সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে যখন জেনেভায় দুই দেশের কর্মকর্তারা আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি সবশেষ আলোচনার পর ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ না রাখার (শূন্যে নামিয়ে আনা) বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি। তিনি এই অগ্রগতিকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শুক্রবার এই বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ইরানে হামলা চালিয়ে বসেছে ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার। গতকাল শনিবার সকালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ইসরায়েল জুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে। এর কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানান, দেশের ওপর থেকে ‘হুমকি সরাতে’ তারা ইরানের ওপর ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক’ চালিয়েছেন।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপের শঙ্কা বাড়ছিল। অনেক যদি-কিন্তু থাকলেও, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে কূটনৈতিক তৎপরতা ও পরোক্ষ আলোচনাতেও বসেছিল দুই পক্ষ। যুদ্ধ এড়ানোর কূটনৈতিক চেষ্টার মধ্যেই ফের নতুন করে উত্তেজনা ছড়াল মধ্যপ্রাচ্যে। আগামী সপ্তাহেও এই আলোচনা চলার কথা ছিল। সবশেষ আলোচনায় ইরান কিছুটা নমনীয় হলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে তিনি মোটেও ‘খুশি’ নন। এর আগে তিনি ইরানকে চুক্তি মানতে বাধ্য করতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। আবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যখনই কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখনই তা নস্যাৎ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে ইসরায়েল। কাতারভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজ’-এর পরিচালক ও জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মেহরান কামরাভা এমনটাই মনে করেন। তার মতে, এবারের হামলাটি শুধু সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে আলোচনার পথ বন্ধ করার একটি বড় কৌশল।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কামরাভা বলেন, গত জুনের মতোই এবারও হামলা চালিয়ে ইসরায়েল মূলত তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচনা ভেস্তে দিতে চাইছে। তারা বরাবরই এ ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগের ঘোরবিরোধী। তিনি মনে করেন, ট্রাম্প নিজেই নিজেকে এক ‘কোণঠাসা’ পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ এখন আর নেই। মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল নৌবহর বা ‘আর্মাডা’ পাঠানো এবং গত দেড় বছর ধরে ইসরায়েলকে সব কাজে একের পর এক ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়ার ফলে ট্রাম্প এখন নিজের জালে নিজেই আটকা পড়েছেন। তার মতে, ইসরায়েল আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত বেঁধে দিয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে তিনি দাঁড়িয়েছেন যে, ইসরায়েলকে এই মুহূর্তে না বলার ক্ষমতা তার নেই।
২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে এবারই সবচেয়ে বড় সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন এমন সামরিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে, সে বিষয়ে তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ইরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে, শত্রু অনুতপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তারাও কঠোর জবাব দিয়ে যাবে। সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তার দেশের জন্য বড় হুমকি। তিনি এমন কোনো চুক্তির বিরোধী, যেখানে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয় এবং ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। ইরান তাদের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার প্রস্তাব শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো যেমন গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সহায়তা বন্ধের দাবিও নাকচ করে দিয়েছে তেহরান। তাদের দাবি, এসব দাবি মেনে নেওয়া মানে দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা।