শিক্ষার হালচাল ও বিপন্ন মূল্যবোধ

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:০৮ এএম

শিক্ষার বর্তমান হালচাল নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজের আস্থা নেই। কিংবা বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাড়ছে পাসের হারও। ‘এ+’ এর ছড়াছড়ি। এই বাস্তবতায় আমাদের আত্মতুষ্টিতে থাকা উচিত। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ দেখা যাবে, আসলে আমাদের মনে স্বস্তি নেই, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কাঁধে পুস্তকের বিশাল বোঝা ও গলায় ‘এ+’ এর তকমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থীর ফলাফল প্রমাণ করে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের পড়ালেখা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের তুলনায় নম্বর অর্জনেই অধিক পরিমাণে সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন হলো, এই দায় কার? এ জন্য কি শুধু শিক্ষার্থীরাই দায়ী? বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া (বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে) কিছুসংখ্যক ছাত্র যথাযথভাবে জ্ঞান অর্জনের সাধনায় ব্রত থাকলেও, অধিকাংশই যেন লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন ও কালক্ষেপণের জালে আটকা পড়ে। ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্যবাহী ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে সংকীর্ণ স্বার্থের তথাকথিত নামমাত্র ছাত্ররাজনীতির কবলে পড়ে অছাত্রসুলভ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ে নিজের এবং দেশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে। প্রশ্ন হলো এই দায় কার? মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই বেহাল অবস্থার জন্য দায় বহন করতে হবে সেই সব মানুষদের, যারা বিদ্যমান সমাজব্যবস্থায় অভিভাবকের ভূমিকায় রয়েছেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থার নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে এই ব্যবস্থার বাস্তবায়নকারী সরকারি সংস্থা ও শিক্ষকম-লী সবার ওপরই দায় বর্তায়। জ্ঞানচর্চা উপযোগী কারিকুলাম ও সিলেবাস তৈরির ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের কাছে, বাংলাদেশের বিবদমান রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিতর্ক কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে নেয়। এর ফলে বিসর্জনে যায় জ্ঞানবান্ধব পাঠ্যসূচি। তাই প্রয়োজন একটি নীতিনির্র্ধারণী ব্যবস্থা, যা হবে জ্ঞানভিত্তিক। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে কর্মরত অধিকাংশ অদক্ষ কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার জন্য, পাঠ্যপুস্তকে নানা প্রকার ভুলভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয়। তাই প্রয়োজন আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের দায়িত্বশীল করে তোলা।

শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বিদ্যমান শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম একটি দুর্বল দিক। এর দু’টি কারণ রয়েছে: (১) ক্রমান্বয়ে ‘শিক্ষকতা’ পেশা হিসেবে মেধাবীদের কাছে অনাকর্ষণীয় হয়ে ওঠা এবং (২) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব (যেমন অর্থের বিনিময়ে অনৈতিক পন্থায় অযোগ্য ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া)। প্রথম সমস্যাটির কারণ হলো, শিক্ষকদের (বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে) অযৌক্তিক বেতন কাঠামো (অর্থাৎ বেতন স্কেলের তালিকায় নিচের দিকে অবস্থান)। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এই চিত্রটি ভিন্ন। দ্বিতীয় কারণটি আরও উদ্বেগজনক। পেশা হিসেবে শিক্ষকতা মেধাবীদের কাছে অনাকর্ষণীয় হওয়ায় এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই অনৈতিক পন্থায় অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা এই মহান পেশায় প্রবেশ করছেন। এখন প্রশ্ন হলো, একজন অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তির কাছে শিক্ষার্থীরা কী পাবে? কী প্রত্যাশা করতে পারে? এই বাস্তবতা আমাদের সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা এই অনৈতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়, সে তার নিজের সন্তানসহ সবার সন্তানকে একটি অযোগ্য ও নৈতিকতা বিবর্জিত ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য করেন।

আমাদের অনেকেই কোনো একটি রাজনৈতিক ভাবাদর্শের সমর্থক। এতে কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয় না। এটিই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সৌন্দর্য। সমস্যা তৈরি তখনই হয়, যখন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা গৌণ হয়ে যায় এবং রাজনৈতিক ভাবাদর্শগত পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে। এটিই সমস্যার মূল কারণ। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, এই ধরনের নিয়োগ স্বয়ং নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি কিংবা নিয়োগদাতা কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। কারণ তাদের কেউ নিশ্চয়ই চায় না যে, তাদের সন্তানকে বিশেষ কোনো ভাবাদর্শে বিশ্বাসী কিন্তু অনৈতিক ও অযোগ্য একজন ব্যক্তি পাঠদান করবেন। একজন যোগ্য ও নৈতিকতাসম্পন্ন ব্যক্তি তাদের সন্তানকে পাঠদান করুক তাই তারা প্রত্যশা করে। আর তা কামনা করাটাই স্বাভাবিক। অথচ নিজ সন্তানসহ অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর এ ধরনের বিতর্কিত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমরা অবলীলায় সম্পৃক্ত হচ্ছি, যার কুফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃষ্টিগোচর না হলেও, পরিণামে এর কুফল আমাদের ভোগ করতে হবে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার কিছু কুফল আমরা ইতিমধ্যেই ভোগ করতে শুরু করেছি। অর্থাৎ ভুক্তভোগী আমরা ও আমাদের সন্তানরা সবাই। এ থেকে বেরিয়ে না এলে, সঠিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে জ্ঞাননির্ভর ও নৈতিকভাবে আলোকিত একটি সমাজ তৈরির লক্ষ্য অর্জনে আমরা চরমভাবে ব্যর্থ হব। অনেক প-িত মনে করেন, উন্নয়নের ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়। উন্নয়নের নামে দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব করা এবং মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় যেমন, পাহাড় ধস, বনাঞ্চল ধ্বংস করা, কিংবা উপকূলীয় এলাকায় দূষণ উন্নয়নকে টেকসই করে না বরং সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের তথাকথিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অর্জিত উন্নয়ন যে  টেকসই নয়, এমন শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো, শিক্ষা ও সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা ইত্যাদি। সামাজিক উন্নয়ন যে ক’টি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে তার অন্যতম দুটি হলো-সুশিক্ষা ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা। প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই দুটি লক্ষ্য অর্জন করা যাবে? এর সহজ কোনো উত্তর নেই কিংবা বলা যেতে পারে যে, এ লক্ষ্য অর্জনে চূড়ান্ত কোনো কর্মতালিকা তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

জরুরি পদক্ষেপগুলোর পাশাপাশি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর যথাযথ চর্চার কোনো বিকল্প এক্ষেত্রে নেই। দার্শনিক অ্যারিস্টটল এই মূল্যবোধকে সদ্গুণ (Virtue) নামে চিহ্নিত করেছেন। সদ্গুণ হলো সমাজে যে গুণগুলোকে সবাই মিলে স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং চর্চা করেন। যেমন সততা, মহানুভবতা, বীরত্ব ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলোর চর্চা কি আমাদের সমাজে ব্যাপক পরিসরে হয়? বিশেষ করে বাংলাদেশের বিদ্যমান সমাজ জীবনে এর চর্চা কি কাক্সিক্ষত পরিমাণে হয়? একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, মূল্যবোধ তথা সদ্গুণের চর্চা শুধু হ্রাসই পায়নি বরং প্রায় বিপন্ন হতে চলেছে। যেমন এক সময় এই সমাজের মানুষই সাধারণত জীবিকা তথা পেশা হিসেবে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, মজুরি ইত্যাদি রীতি ও নীতিসিদ্ধ কর্মপন্থাকেই উপার্জনের একমাত্র উপায় হিসেবে গণ্য করতেন। মিথ্যা বলা, চুরি করা কিংবা অন্যকে ঠকানো এই সব কর্মে লিপ্ত হতেন নেহায়েত বিপদে পড়ে। যেমন অভাবগ্রস্ত পিতা-মাতা সন্তানের জন্য জীবন রক্ষার্থে অন্ন জোগাড় করার জন্য মিথ্যা বলা, চুরি করা, লোক ঠকানোর মতো গর্হিত কর্মে লিপ্ত হতেন। কিন্তু বর্তমানে আমরা লক্ষ করছি অনেকেই চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি রীতি নীতিসিদ্ধ কর্মই নয় বরং মিথ্যা বলা, চুরি করা কিংবা লোক ঠকানোকেও উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছেন। একে কী বলা যায়? মূল্যবোধের অবক্ষয়, নাকি মূল্যবোধ আমূল পাল্টে যাওয়া। ফলে মূল্যবোধের অবক্ষয় বলে এতদিন যা বলা হতো, তা শুধু তলানিতেই গিয়ে পৌঁছায়নি বরং মানুষের নীতিনৈতিকতা সংক্রান্ত ভাবনার জগতে এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। দ্রুতগতিতে মূল্যবোধ পাল্টে যাওয়া একটি সমাজে আমাদের বসবাস। পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে মূল্যবোধের চর্চায় আমরা অনেক পাল্টে গেছি! কেউ যেন কারও কাছে নিরাপদ নয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক নিরাপদ নয়, শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী নিরাপদ নয়, শিক্ষার্থীর কাছে ছাত্ররাজনীতি নিরাপদ নয়, এমনকি কোনো কোনো পিতা-মাতার কাছে সন্তানও নিরাপদ নয়। আমরা বেদনায় কাতর হই, যখন দেখি নবজাতক তার মায়ের কাছে নিরাপদ নয়। ডাস্টবিনে ফেলে গিয়ে মা নিশ্চিন্ত রজনী পার করেন। এমন ঘটনা প্রায়শই লক্ষ করা যায় যে, পিতামাতার কাছে অসৎ উপায়ে অধিক উপার্জন করা সন্তানের গুরুত্ব, সৎ উপায়ে কম উপার্জন করা সন্তানের তুলনায় বেশি।

অনেকে বলতে পারেন, এ ধরনের ঘটনা কদাচিৎ ঘটে। এই দাবি হয়তো পুরোটা সত্য নয়।  কারণ এখনো রীতিনীতি মেনে চলার ব্যক্তি ও পরিবারের অনেক উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু যে গতিতে মূল্যবোধ চর্চার ধারা পাল্টাচ্ছে, তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে পূর্ণাঙ্গ বিপর্যয় আসতে আর বেশি সময় লাগবে না। তাই সরকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে যারা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করছেন তাদের উচিত কালক্ষেপণ না করে ভোগবাদী চিন্তা ও কায়েমি স্বার্থ থেকে বের হয়ে আসা। অভিভাবকদের এই পদক্ষেপ আমাদের সন্তান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে। সমাজে অন্য সব দিকগুলোর মতো শিক্ষা কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়বে এবং এতে আসবে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন ও সফলতা। সমাজ, পরিবারেরই সমষ্টি। সুতরাং পরিবার পর্যায়ে মূল্যবোধ দ্রুত পাল্টে যাওয়ার ঘটনা, সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে। এমন একটি নৈতিক কাঠামোহীন, তথা পাল্টে যাওয়া মূল্যবোধের সমাজে শিক্ষা কার্যক্রমসহ সব আইনি বাধ্যবাধকতাও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। কারণ যারা নৈতিকতার শিক্ষা দেবেন কিংবা আইন প্রণয়ন করবেন, তারা নিজেরাই যখন নীতিহীনতা ও বেআইনি কাজে লিপ্ত হয়ে যান, সেই সমাজের শিক্ষা কার্যক্রম সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে না। আমাদের সন্তানের সুশিক্ষা, তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিকভাবে বেড়ে  ওঠার পরিবেশ তৈরি করার জন্য প্রয়োজন একটি অলোকিত ও কার্যকর জীবন ধারায় ফিরে আসা। আর এ জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ তথা সদ্গুণের বিরতিহীন চর্চা।  প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পর্যায়ে মূল্যবোধের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকরভাবে এর চর্চার জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তা না হলে, অচিরেই নৈতিক কাঠামোহীন সমাজের চোরাগলিতে হারিয়ে যাবে জ্ঞাননির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্ন।

লেখক: উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত