দেশের জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ‘ই-হেলথ’ কার্ড চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্তি প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন গতকাল সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ এবং ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠন’-সংক্রান্ত বিশেষ সেলের কার্যক্রমের সর্বশেষ অগ্রগতি মূল্যায়নসংক্রান্ত বৈঠক হয়।
বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ই-হেলথ কার্ড চালু করার কাজ শুরু করতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে যথাযথ নির্দেশনা দিয়েছেন। সরকারের নীতি হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় হওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। বৈঠকে সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পরিত্যক্ত ভবনগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্র করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
তিনি বলেন, শুধু এলজিইডির পরিত্যক্ত ভবন বা বিল্ডিং রয়েছে ১৭০টি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সরকারি ও তার অধীন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার এরকম পরিত্যক্ত ভবন বা বিল্ডিং রয়েছে, সেগুলো ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি সভায় আলোচনায় উঠে এসেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর ৩৪ লাখ নবজাতক জন্মগ্রহণ করে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রতি বছর নবজাতক জন্মের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয় বৈঠকে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়কে তৎপর হতে বলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী যার মধ্যে নারী ৮০ শতাংশ এবং পুরুষ ২০ শতাংশ; তা নিয়োগ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ৭৪ হাজার শূন্য পদে (চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী) নিয়োগের বিষয় নিয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।
দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেন চিকিৎসকরা যান সেজন্য মন্ত্রীকে তাগাদা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এমএ মুহিতসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সারা দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদারের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : সকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ-সংক্রান্ত সেলের সভা হয়েছে। সভায় সেলের কার্যক্রমের সর্বশেষ অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী সারা দেশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করতে বলেছেন। সারা দেশে ৫ বছরের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি নার্সারি ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘সারা দেশে খাসজমি, চরাঞ্চল, নদীর দুই পাড়ে, সড়ক-মহাসড়কের দুধারে, বনাঞ্চলে যেখানে বৃক্ষ নেই সেসব স্থানে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙিনাসহ বিভিন্ন স্থানে এসব বৃক্ষরোপণ করা হবে। প্রতি শিক্ষার্থী একটি করে বৃক্ষরোপণ করবে এবং সেই বৃক্ষ তারা পরিচর্চা করবে।’
বৈঠকে বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে পরিবেশমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এক বছরের মধ্যে সারা দেশে পাঁচ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে। আগামী মে থেকেই এ কর্মসূচি শুরু হবে।’ এ সময় পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের পরে কার্বন বাণিজ্যকে সর্বোচ্চ বাণিজ্য খাতে রূপান্তর করতে চায় সরকার।
পহেলা বৈশাখের মধ্যে কৃষক কার্ড কার্যক্রম শুরু করার আশা : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ পহেলা বৈশাখের মধ্যে কৃষক কার্ড কার্যক্রম শুরু করার আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি প্রাথমিকভাবে পাইলট আকারে ৮ থেকে ৯টি উপজেলায় চালু হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মিটিং হয়েছে। আমরা যারা ওই কমিটিতে ছিলাম, আমরা আশা করছি, পহেলা বৈশাখের মধ্যেই শুরু করতে পারব।’ এটি সারা দেশে একযোগে নাকি পাইলট ভিত্তিতে চালু হবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাইলট আকারে যাবে এটা। এখন ৮-৯টা উপজেলার মধ্যে যাবে।’
একটি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী বলেন, যারা প্রান্তিক কৃষক আছেন, একেবারে প্রান্তিক কৃষক, তাদের কিছু বেনিফিট দেব ফ্যামিলি কার্ডের মতো। আর পরে অ্যাকচুয়ালি আমাদের এই কার্ডের মূল উদ্দেশ্য যেটা আছে, সেটা হলো উৎপাদন, ভোক্তা, কৃষিজমি, কৃষিপণ্য, ভ্যারাইটি সবকিছু যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে কৃষক পেতে পারে এবং সরকারের কাছে যেন সব তথ্য সঠিকভাবে আসতে পারে।
বিনামূল্যে সার-বীজের কথা বলা হয়েছিল। বিনামূল্যে সার-বীজ কি পাবেন কৃষকরা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিনামূল্যে সার প্রান্তিক কৃষকদের ব্যাপারে বা একেবারে গরিব কৃষকদের প্রশ্নে বোধহয় ছিল। এটা নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়নি। আপনাদের কাছে কৃষক মানে কারা আসলে থাকবে এই পাইলট প্রজেক্টে? কৃষক হিসেবে কাদের আপনারা চিহ্নিত করছেন জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, যারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত তারা।
এর আগে গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী দেশের শান্তি, নিরাপত্তা এবং জনগণের স্বার্থে জনসেবামূলক কাজ অব্যাহত রাখতে মহাপরিচালককে নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে নিকার গঠন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) গঠন করেছে সরকার। গতকাল বুধবার ২০ সদস্যের নিকার গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
স্থানীয় সরকার, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, শিল্প এবং আইনমন্ত্রী; জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবকে নিকারে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এর বাইরে জনপ্রশাসন, ভূমি, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ, সমন্বয় ও সংস্কার, আইন ও বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিবকে নিকারের সদস্য করা হয়েছে।
নতুন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর এবং পরিদপ্তর স্থাপন, পুনর্গঠন এবং নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনা করে নিকার। এ ছাড়া নতুন বিভাগ, জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, থানা গঠন বা স্থাপনের প্রস্তাব বিবেচনা এবং বিভাগ, জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, থানার সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত প্রস্তাব বিবেচনা করে নিকার।