শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে কে জিতবে?

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০১:৪১ এএম

বিগত দিনে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে অভিযোগগুলো প্রচার করেছে, তা মূলত প্রপাগান্ডা। এর উদ্দেশ্য সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ বা হস্তক্ষেপের জন্য সম্মতি উৎপাদন করা। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে আক্রমণ করা সহজ ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে প্রপাগান্ডা শেষে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রচ্যের শান্তিরক্ষার নামে মার্কিন-ইসরায়েল ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিচালনা করার মাধ্যমে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এই অপারেশনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর্মকর্তা নিহত হন। এই হামলায় পর ইরানও পাল্টা জবাব দেয়। ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে, ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যে চলমান সংঘাত গত ৭ দিনে আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে এর অভিঘাত। হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা চলেছে। স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রপথে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন অস্থির ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি আরও বিস্তৃত হয়, তবে তা শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিকে নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলবে। ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ১৭টি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির লোকজনকে চলে যেতে বাধ্য করেছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই ঘটনা দ্বিতীয় ঘটেনি।

ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি, সামরিক দক্ষতা এবং কূটনৈতিক সমন্বয় পুরো বিশ্বের নজর কাড়ছে। ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া মূল কারণ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের অংশীদারত্বের প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধি, চীনের বাণিজ্য ও সামরিক শক্তিকে সীমিত করা এবং সামরিক অস্ত্র ও বাণিজ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা। এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মাথাব্যথা চীন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থে সরাসরি আঘাত করছে। চীনের এই বিস্তৃতি শুধু এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয় ইউরোপ, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তাদের বাণিজ্য ও শিল্পপ্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের প্রভাব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক অগ্রবর্তী রাখতে পারে। এই কারণে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘গ্রেট আমেরিকা’ ধারণা বজায় রাখতে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলে ইরানকে লক্ষ্য করা হয়েছে, যাতে ইরানের ওপর আঘাত সৃষ্টি করে চীনের তেলের সরবরাহে বাধা দেওয়া যায়। তেলের এই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের শিল্পকারখানা বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালী, যা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রধান রুট, তা দখল করাও এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকারি কাঠামো ও নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। যার ধারাবাহিকতায় খোমেনিসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যা করছে। এমনকি ভবিষ্যতে খোমেনির ছেলেকেও লক্ষ্য করা হবে এবং নতুন সরকার অবশ্যই ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী হতে হবে এ কথা বলছেন তিনি। চীন হরমুজ প্রণালী থেকে মোট তেলের প্রায় ৩৮ শতাংশ সংগ্রহ করে এবং তার শিল্প উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই তেলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালী চীনের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রিসোর্স। যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নিজের প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তার করে, তবে চীন এই তেল সরবরাহে সীমাবদ্ধতা বা বন্ধের সম্মুখীন হতে পারে। এতে চীনের শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে চীনের কৌশলগত স্বার্থ সরাসরি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়ায়। এই কারণে চীন কোনোভাবেই ইরানে মার্কিন-সমর্থিত বা ‘তাঁবেদার’ সরকার দেখতে চায় না। চীনের মূল লক্ষ্য হলো ইরানে স্থিতিশীল এবং নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম সরকার থাকা, যাতে হরমুজ প্রণালী থেকে তেল প্রবাহ অব্যাহত থাকে। চীনের স্বার্থ অনুযায়ী, ইরানকে মার্কিন প্রভাব থেকে দূরে রাখা অপরিহার্য। অন্যদিকে, রাশিয়াও দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতা করছে। ইরান রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সহায়ক, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার এবং পশ্চিমা শক্তির মোকাবিলায়। রাশিয়ার স্বার্থও চীনের মতোই স্পষ্ট। রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ইরানকে শক্তিশালী রাখছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারকে কঠিন করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হস্তক্ষেপ, নতুন সরকার পরিবর্তন বা আধিপত্য বিস্তার, চীন ও রাশিয়ার স্বার্থকে সরাসরি আঘাত করবে। তাই ইরান একা নয়, চীন ও রাশিয়া তার পাশে। চীনের শিল্প ও তেল নির্ভরতা, রাশিয়ার সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থ মিলিয়ে ইরানকে মার্কিন-ইসরায়েলি প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা তাদের নীতি ও কৌশলের মূল লক্ষ্য। ভারত হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ১৫ শতাংশ তেল সংগ্রহ করে এবং তার শিল্প ও শক্তি নিরাপত্তার জন্য এই সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে আধিপত্য বিস্তার করে, তবে ভারতের তেল সরবরাহও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ভারতও চীনের মতোই চায় না ইরানে মার্কিন আধিপত্য তৈরি হোক। তাই ভারত গোপনে যতটা সম্ভব ইরানকে অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং রাজনৈতিকভাবে সাহায্য করছে। ভারত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন, তেলের চুক্তি এবং অন্যান্য সহযোগিতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীল ও স্বাধীন কাঠামো বজায় রাখতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের তেল রুট এবং ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর ভারতের এই কৌশলগত আগ্রহ চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মিলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষা করছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বিপরীতে ইরান অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। খালি চোখে মনে হতে পারে ইরান একা লড়ছে, তবে নেপথ্যে দেশটিকে শক্তিশালী করছে রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তা। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে, এই দুই পরাশক্তি তেহরানকে আধুনিক মিসাইল গাইডেন্স, জ্যামিং সিস্টেম এবং সাইবার যুদ্ধে সহায়তা করছে, যা মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। ইরান স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে এটি যুদ্ধ বিরতি নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত। রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পর্দার আড়াল থেকে চীন ও রাশিয়া ইরানকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

চীনের বিস্তৃত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এখন পশ্চিম এশিয়ার আকাশে এক পাহারাদারের মতো কাজ করছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি পদক্ষেপ তৎক্ষণাৎ ইরানের নজরে আসে এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। এছাড়া মার্কিন জ্যামিং প্রযুক্তি কার্যকর হচ্ছে না, কারণ চীনের স্যাটেলাইট-ভিত্তিক সহায়তা ইরানের জন্য কার্যকর প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে রাশিয়া এই সংঘাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। রাশিয়া ইরানকে উন্নত সাইবার যুদ্ধের সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তি এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি মিসাইল সিস্টেমের কার্যকারিতা ও দুর্বলতার তথ্য সরবরাহ করছে। ইরান এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মার্কিন ড্রোন এবং নির্ভুল মিসাইলকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইরান রাশিয়ার তৈরি কাসুকা-৪ (Kasuka-4) এবং মার্মানস্ বিএন সিস্টেম (Marmans BN system) ব্যবহার করছে, যা ৩-৫ কিমি পর্যন্ত শত্রুর স্যাটেলাইট জ্যাম করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন মিসাইলের গাইডেন্স কমে যাওয়ায় এই জ্যামিং প্রযুক্তি প্রধান ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে প্রায় ৩৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা বহন করছে, যা দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরকারি ঋণ। এমন উচ্চঋণ অবস্থায় নতুন করে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যাপক অর্থনৈতিক ব্যয় সামলানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনৈতিক চাপ ছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ জনগণ ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সামরিক ব্যয় এই সংঘাতে অত্যন্ত বেশি। প্রথম ১০০ ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন সামরিক খরচ প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার।

গত ৭ দিনে উভয়ের মোট ব্যয় হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মার্কিন সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান সম্পর্কে সতর্কতা জানাচ্ছেন। তাদের মতে, ইরানকে সরাসরি হারানো সহজ হবে না, দেশে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতিতে চাপ, মার্কিন সেনাদের জীবন ও সামরিক সম্পদও বিপন্ন করবে। যুদ্ধের জয়-পরাজয় শুধু অস্ত্র দিয়ে নিরীহ মানুষ হত্য, স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না, বরং জয় নির্ধারিত হয় উদ্দেশ্য পূরণের মাধ্যমে। সাময়িকভাবে ইরানকে দখল করা অথবা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন করা সম্ভব হলেও তাদের ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস, ঐতিহ্য, দেশপ্রেম, মূল্যবোধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌম চেতনা দখল যাবে কি? মার্কিন-ইসরায়েলের সেই উদ্দেশ্য সম্ভবত সফল হবে না। ইরান পারস্য সভ্যতার ধারক। যার ইতিহাস কমপক্ষে ২৫০০ বছর পূর্বে শুরু। যা এই ভূখণ্ডের রক্ত-মাটির সঙ্গে মিশে আছে। পারস্য সাম্রাজ্য থেকে সাসানিয়ান রাজবংশ, ইসলামি ইরান, মধ্যযুগীয় সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং এর ঐতিহাসিক বহমান ধারা, অভিজ্ঞতা ইরানকে এক শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলের হামলা, মিসাইল, ড্রোন বা তল্পিবাহক সরকার বসানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। ইরানিরা তাদের দেশপ্রেম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অনুভূতিতে দৃঢ়, যা হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূলে নিহিত। অনেকে বলছেন এই যুদ্ধে ইরান বেশিদিন টিকতে পারবে না। হতে পারে, সামরিক সংঘাতে তারা প্রবল চাপে পড়বে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কেন টিকে থাকবে না? যদি একটি জাতি নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংকল্পে অটল থাকে, তবে তার সাময়িক সব ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি পরাজয়ে রূপ নেয় না, বরং তার টিকে থাকাই একসময় বিজয় সুনিশ্চিত করে। অতীতে ইরান কখনো মাথানত করেনি, এবারও করবে না।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত