ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত মাসেই সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নতুন সরকারের শুরুতেই বিভিন্ন সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল চলছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগ করেছেন বীমা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তবে রদবদলের আলোচনায় থাকা আর্থিক খাতের অন্যতম সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
এদিকে কমিশনের রদবদলের আলোচনার মধ্যে গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হয়েছে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ। ফলে টানা পতনে থাকা শেয়ারবাজার পরিস্থিতিকে অনেকে যুদ্ধের প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে সচেতন মহল বলছে, যুদ্ধের প্রভাবের সঙ্গে কমিশনের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে শেয়ারের দরপতন অব্যাহত রয়েছে।
পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো কমিশন নিয়োগের পর বাজার উন্নয়নে নানা প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু দিন শেষে তেমন কোনো কিছুই দেখা যায় না। বর্তমান কমিশন একটি কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বিনিয়োগকারীদের আশা ছিল, কমিশন পুঁজিবাজারে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনবে। যদিও কিছু বিও হিসাব বন্ধ করা ও কয়েকজন ব্যক্তিকে বাজারে নিষিদ্ধ করা ছাড়া তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ ছাড়া বর্তমান কমিশন বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি। আবার যেসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের জরিমানা করা হয়েছে, তা আদায়ের তথ্য জানা যায়নি।
অনেকে অভিযোগ করছেন, সাবেক অর্থ উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিএসইসির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে বর্তমান কমিশন নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে বাজার পরিস্থিতি নাজুক হওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দফায় দফায় কমিশনের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিশেষ করে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ইসলামি ব্যাংক একীভূতের ঘটনায় ওইসব প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। এতে রাতারাতি পুঁজি হারান লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। এর সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি বর্তমান কমিশন। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অন্যদিকে কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিবর্তন করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে অর্থনীতির জন্য ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিএসইসি ও নির্বাচন কমিশন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্বে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন অনেকে।
এদিকে গত সপ্তাহ জুড়ে দেশের শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। এতে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনে অংশ নেওয়া যে কটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, তার পাঁচ গুণের বেশি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। এতে ডিএসইর বাজার মূলধন ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে কমে গেছে। একই সঙ্গে বড় পতন হয়েছে সবগুলো মূল্যসূচকে। পাশাপাশি কমেছে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ।
সপ্তাহ জুড়ে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র ৫৯টির শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৩২৫টির দাম কমেছে এবং আটটির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ দাম বাড়ার তুলনায় দাম কমার তালিকায় স্থান হয়েছে ৫ দশমিক ৫১ গুণ বেশি প্রতিষ্ঠানের।
এমন দরপতন হওয়ায় সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসের লেনদেন শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, যা আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৭ লাখ ১৮ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ২০ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
শেয়ারবাজার পরিস্থিতির বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের কারণে বিশে^র শেয়ারবাজারগুলোয় প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। উন্নত দেশের পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ তুলে নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের শেয়ারবাজারেও পতন হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যে পতনের ঘটনা, তা স্বাভাবিক। এর পেছনে জ¦ালানি তেলের দাম হুহু করে বাড়াকে কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের রাস্তাটি বন্ধ থাকায় জ¦ালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ছে। দেশে দেশে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘমেয়াদি হলে এর প্রভাব আরও বাড়বে। ফলে শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের আরও সচেতনভাবে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এদিকে গত সপ্তাহে বাজার মূলধন বড় অঙ্কে কমার পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকেরও বড় পতন হয়ছে। সপ্তাহজুড়ে ডিএসইএক্স কমেছে ৩৫৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট বা ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। আগের সপ্তাহে সূচকটি বাড়ে ১৩৪ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট বা ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের গতিও কমেছে। সপ্তাহের প্রতি কার্যদিবসে ডিএসইতে গড়ে লেনদেন হয়েছে ৬৯৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আগের সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৭২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্যদিবসে গড় লেনদেন কমেছে ২৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ৩ দশমিক ৯১ শতাংশ।