মিচেল স্যান্টনারের গলায় কি প্যাট কামিন্স কথা বললেন? বছর দুই আগে, এই নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনে, ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালের আগের দিন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বলেছিলেন, ‘খেলাধুলার জগতে বিশাল এক গ্যালারিকে নিস্তব্ধ করে দেওয়ার চেয়ে তৃপ্তিদায়ক আর কিছুই নেই, আর আগামীকাল আমাদের লক্ষ্য হবে ঠিক সেটাই।’ শনিবার নিউজিল্যান্ডের অধিনায়কও বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার মনে হয় লক্ষ্যটা ঠিক এটাই, তাই না? গ্যালারিকে নিশ্চুপ করে দেওয়া’। সংবাদ সম্মেলনের পর সেই একই ভাবে দাঁড়িয়ে উইকেটের ছবি তুললেন স্যান্টনার। আরেকটা বিশ্বকাপ, দেশের মাটিতে ফাইনাল এবং শিরোপা আর ভারতের মধ্যে তাসমান সাগর পাড়ের একটা দল। অতীতে এই সব কিছুর যোগফলে ভারত দেখেছে নীল সাগরে হলুদ ঢেউ। এবার কি সূর্যোদয় নাকি অমবস্যার নিকষ অন্ধকার? কাকতালীয় ভাবে নিউজিল্যান্ডের জার্সির রঙটাও কালো, দলটার পোশাকি নাম ব্ল্যাকক্যাপস।
রাহুল দ্রাবিড় প্রচ- যুক্তিবাদী একজন মানুষ। প্রচেষ্টা, ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের জোরেই তার সাফল্য। ক্রিকেটে মাঠে নামার আগে অনেকের নানান রকম কুসংস্কারের কথা শোনা যায়, এমনকি ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালেও মহেন্দ্র সিং ধোনি ব্যাটিং করার সময় শচিন টেন্ডুলকার ড্রেসিংরুমে কাউকে নড়তে দেননি। দ্রাবিড়কে নিয়ে এ রকম কিছু শোনা যায়নি কখনোই। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফাইনালের আগে তাই পূজা-অর্চনা, বাস্তুশাস্ত্র এসবের ধার ধারেননি দ্রাবিড়। কিন্তু এবার বিসিসিআই কর্তারা কোনো ত্রুটি রাখতে চাচ্ছেন না প্রস্তুতিতে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে চন্দ্রগ্রহণের সময় অনুশীলন করেননি ভারতীয় ক্রিকেটাররা, মুম্বাইতে সিদ্ধি বিনায়কের মন্দিরে গিয়েছিলেন অভিষেক শর্মা, অক্ষর প্যাটেল আর ইশান কিশান। এবার ফাইনালের আগের রাতে হোটেল বদল ভারতীয় ক্রিকেটারদের। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল ও সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে আইটিসি নর্মদা হোটেলেই থেকেছে ভারতীয় দল। এবার রাতারাতি হোটেল বদলে সূর্যকুমার যাদবদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাজ স্কাইলাইনে।
দুই ফাইনালিস্টের মধ্যে একটা দারুণ মিল হচ্ছে, নিউজিল্যান্ড ও ভারত দুই দলই এই বিশ্বকাপে হেরেছে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে। এবং সেটা আহমেদাবাদেই। নিউজিল্যান্ড হেরেছে গ্রুপ পর্বে, ভারত সুপার এইটে। দুই দলের কাছেই তাই আহমেদাবাদ অপয়া। ফাইনালের ২২ গজ সম্পর্কে স্যান্টনারের ধারণা, ‘আমি এখনো উইকেট দেখার সুযোগ পাইনি, এটা এখনো ঢেকে রাখা; তবে ধারণা করাই যায় যে উইকেট বেশ ফ্ল্যাট হবে এবং প্রচুর রান উঠবে।’ স্যান্টনারের কথার প্রমাণ অবশ্য আছে পরিসংখ্যানে। কানাডার বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার রান-উৎসব, কিংবা আফগান-প্রোটিয়া ম্যাচের ডাবল সুপার ওভারের রোমাঞ্চ; সবই দেখেছে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম। তবে শঙ্কার জায়গা হচ্ছে, এই স্টেডিয়ামে সর্বনিম্ন দলীয় ইনিংসটা ভারতের, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১১১।
নিউজিল্যান্ডের বৈশ্বিক শিরোপা এখন পর্যন্ত মাত্র ২টি। ২০০০ সালের আইসিসি নকআউট ট্রফি (যা পরে হয়েছে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি) আর ২০২১ সালে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। দুটোরই ফাইনালে নিউজিল্যান্ড হারিয়েছে ভারতকে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডকে হারাতে পারেনি ভারত। ২০০৭, ২০১৬, ২০২১ তিনবারের দেখায় তিনবারই হার। সেই দলের বিপক্ষে জিততে পারবে কি সূর্যবাহিনী, নাকি সবরমতীর তীরে ফাল্গুনের কৃষ্ণপক্ষে নেমে আসবে অকাল অমাবস্যা?
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল দেখিয়ে দিয়েছে, ব্যাটিং নিয়ে যত কথাই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয় জাসপ্রিত বুমরার ২৪টা ডেলিভারি। গত বছর দুয়েকে ভারত যে দুজনের ওপর ভর করে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জিতেছে টি-টোয়েন্টিতে, সেই অভিষেক শর্মা আর বরুন চক্রবর্তী গোটা বিশ্বকাপেই ফ্লপ। বরুণের রহস্যভেদ করে ফেলেছে প্রতিপক্ষের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট, উঁচুমানের অফস্পিনে অভিষেকের দুর্বলতাও ফাঁস হয়ে গেছে। দুই বার প্রথম ওভারেই অফস্পিনারের বলে ক্যাচ দিয়েছেন অভিষেক, একবার সালমান আগার বলে আর অন্যবার উইল জ্যাকসের বলে। ফাইনালের মিচেল স্যান্টনার কি কোল ম্যাকনকি কিংবা গ্লেন ফিলিপসের হাতেই শুরুতে বল তুলে দেবেন?
ভারতের যদি সঞ্জু স্যামসন থাকেন, নিউজিল্যান্ডের আছে ফিন অ্যালেন। আগের ম্যাচে ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করেছেন, প্রোটিয়া বোলারদের কেউ কেউ দুঃস্বপ্নে এই কিউই ব্যাটসম্যানকে হয়তো দেখবেন আগামী মাসকয়েক। সুইপ মারতে ওস্তাদ, বরুণ কিংবা অক্ষর কারোরই তার কাছ থেকে রেহাই পাওয়ার কথা নয়। পূর্বপুরুষের দেশ বলে রাচীন রবীন্দ্র নিশ্চয়ই ছেড়ে কথা বলবেন না। সবশেষ ৩ ম্যাচে তার ৯ উইকেট, শিকার আসলেই তার বাম হাতের খেল।
নিউজিল্যান্ড যেন সেই ভালো ছাত্র, পরীক্ষার আগের রাতে যার জ্বর আসে। ফলে কখনোই হয় না প্রথম হওয়া, যেন নিয়তিই চায় না। একটা সময় নিউজিল্যান্ড ছিল আজীবনের সেমিফাইনালের দল, এবার আক্ষেপটা ফাইনালের। ২০১৫ ও ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি-গত ১১ বছরে ৬টা ফাইনাল খেলে ৫টাতেই হার নিউজিল্যান্ডের। সাদা বল আলাদা করলে ফাইনালে হারের কৃতিত্বে পাঁচে পাঁচ। মিচেল স্যান্টনার এবার সেই ভালো ছেলে তকমাটা ঘুচিয়ে শিরোপাটা জিততে চান। সে জন্য কোটিখানেক মন ভাঙতেও তার আপত্তি নেই!