বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং বিচার পাওয়ার অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। আইন আছে, নীতিমালা আছে কিন্তু বাস্তবে একজন নারী যদি কোনো অপরাধের বিচার চাইতে এগিয়ে আসেন, তখনই শুরু হয় তার আরেকটি কঠিন লড়াই।
একটি মেয়ে যদি কোনো অপরাধের বিচার চায় তাহলে কিন্তু প্রথমেই সেই নারীকে সুরক্ষা বলয়ের ভেতরে নিয়ে আসার কথা আমরা বারবার বলছি, আইনেও সেই সুরক্ষার কথা বলা আছে। প্রথমেই থানাতে তার অধিকার, থানায় একটি নারীবান্ধব পরিবেশ দরকার। প্রথম কথা বেশিরভাগ মেয়েরাই সেকেন্ড টাইম, থার্ড টাইম ভিক্টিমাইস হওয়ার কারণে তারা অভিযোগ করতে চায় না। যখন সে অভিযোগ করতে যায়, তখন তার দিকে যে ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকে, প্রশ্ন করে, এর মানে তাকে ভিক্টিম না ভেবে খারাপ মেয়ে হিসেবে ভাবে। এজন্য একটি নারীবান্ধব পরিবেশ দরকার, যাতে সে তার অভিযোগ দিতে পারে, বিশ্বাস করে। তারপর তাকে লিগ্যাল সাপোর্ট দিতে হবে, আমাদের দেশের প্রচলিত আইনকে ভিক্টিম সেন্ট্রিক হতে হবে। সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্টের মতো সেনসিটিভ কেসগুলোর সময় নারী ও শিশুর জন্য একটি স্পিডি ডাইবে বিষয়গুলো হ্যান্ডেল করতে হবে। এ জায়গাগুলোতে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব লক্ষ করা যায়, কোর্টগুলো এখনো নারীবান্ধব না।
নারীকে যদি ৩৩ শতাংশ বা ২৫ শতাংশ ইলেকশনে দাঁড়ানোর সুযোগ দিত, এখন বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়েছে, কোনো মেয়ে আগ্রহ দেখায়নি। যে মেয়েগুলো আগ্রহ দেখিয়েছিল তাদের ভেতর থেকেই তো নিতে পারত, পলিটিক্যাল পার্টিরা যখন রাস্তায় দাঁড়ায় তখন তো আমরা অনেক মেয়ে দেখি।
কিন্তু ইলেকশন করার সময় বলে, আমার বাবা দেয়নি, বলা হয়, পরিবার থেকে দেয়নি। যেখানে আমাদের দেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নারী সেখানে আমাদের মেয়েরা সুযোগ পায় না। আমাদের মেয়েরা পড়াশোনা করছে, কিন্তু স্থানীয় সরকারে এখন নারীরা নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে নারীর সমতা দরকার। তাহলেই বলব নারীরা এগিয়ে গেছে। এই যে আমরা বলি, প্রতিবাদ করো, প্রতিরোধ করো, সাহস করে এগিয়ে চলো, তাহলে কিন্তু সে কোনো কিছুর শিকার হলে প্রতিবাদ করে, প্রতিরোধ করে, আর সবাই যদি সাপোর্ট দেয় তাহলে সে এগিয়ে যাবে। এ কারণে কিন্তু নারীর বর্তমান প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা দেখছি, এই যে সেক্সচুয়াল হ্যারাসমেন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা নিজেরাই এগুলো তদন্ত করেছি, সেখানে কিন্তু নারীরা অভিযোগ করছে না। আর করলেও একটা পর্যায়ে তা উইড্রো করে ফেলছে। তাদের সাহস ধরে রাখতে হবে, আর অপরাধীদের শাস্তি দিতে হবে। দ্রুত তদন্ত করে এগুলোর বিচার করতে হবে। দেরি হলে আলামত নষ্ট হবে, সাক্ষী নষ্ট হবে, ভিক্টিমরা সেকেন্ড টাইম ভিক্টিমাইজ হবে, নারীরা নিরাশ হয়ে যাবে।
আমি মনে করি, এগুলোর জন্য একটি কমিটি হওয়া উচিত, যে কমিটি এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে। সরকার এ জায়গাগুলোতে কাজ করবে, আমরা সাহায্য করব। তাহলেই কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাঙ্গনে সর্বক্ষেত্রে নারীরা নারী হিসেবে না মানুষ হিসেবেও এগিয়ে যেতে পারবে। নারীদের যোগ্যতা আছে, রেজাল্ট ভালো কিন্তু পরে দেখা যাচ্ছে বেশি দূর এগোতে পারে না। এ জায়গাগুলো আমাদের ভালো করে দেখতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমি নিজেও ছিলাম বাচ্চাদের সঙ্গে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের দুই রকম দেখা হয়েছে। একটা হলো নারীকে অনেক অবমাননা করা হয়েছে, অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং একটা অবক্ষয়, সেটা একই রকম ছিল। আরেকটা হলো, নারীরা রাস্তায়ও নেমে গিয়েছিল, সেখানে তারা কতটুকু এগিয়ে যেতে পেরেছে সে গুরুত্বটা তারা পায়নি।
নারীকে এখনো ভোগ্যপণ্য হিসেবে চিন্তা করে একটা বড় অংশ। জামায়াত কিন্তু নারীকে এখনো মনে করে না নারীরা বাইরে গিয়ে কাজ করবে। নিজেদের যতটুকু এগিয়ে নিয়ে গেছি, সব দিক দিয়ে কিন্তু একটা জায়টায় গিয়ে দেখি, ইলেকশনেই দেখা গেছে কয়টা মেয়েকে দিয়েছে ইলেকশনে দাঁড়াতে। সে জায়গাটা এখনো তৈরি হয়নি। এই যে পরিবেশটা, মেয়েরা আন্দোলনে ঘরে-বাইরে প্রত্যেকটা জায়গায় প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু নারীকে সে জায়গায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো কোনোভাবেই নারীকে সমান অধিকার, সহযোদ্ধা হিসেবে দেখছে না।
ভোটের সময় দেখা গেছে, অনেক মেয়েরাই ভোট দিতে আসেনি। প্রত্যেকটা জায়গায় নারীরা পিছিয়ে গেছে।। আমাদের পাশের দেশে নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে।
নারীর সুরক্ষার কথা বলতে হলে জিরো টলারেন্স নীতিমালা নিতে হবে। আমরা দেখতে চাই আগামী তিন মাসে সরকার কী সুরক্ষা দেবে। তাদের পলিটিক্যাল মেন্যুফেস্টোতে যা ছিল নারীর জন্য তার বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই। অপজিশনে যারা আছে তাদের থেকেও দেখতে চাই। আমরা নারী ও শিশুবান্ধব সরকার চাই এবং এটাই আশা করি, আইন থাকলেই হবে না, আইনের প্রয়োগও যেন হয়।
লেখক : সভাপতি বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি
অনুলিখন : ফাতেমা আলী