বাংলাদেশে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে নারীরা কি সত্যিই সমঅধিকার পাচ্ছে? বাস্তবতা হলো, অতীতেও পরিস্থিতি খুব একটা ভালো ছিল না, আর বর্তমানেও খুব আশাব্যঞ্জক বলা যায় না। নারীরা সমাজে বরাবরই অবহেলিত এবং অনেক ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও নারীরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। কিন্তু রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারীরা এখনো বেশ পিছিয়ে।
এদিকে নারী সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতিনিয়ত অনেক নারী সহিংসতা ও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। ফলে প্রশ্ন জাগে নারীর সমঅধিকার কি সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নাকি তা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ? বাস্তবতা হলো নারী অধিকার নিয়ে যত কথা বলা হোক না কেন বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে নারীদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এসব পদক্ষেপ যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে অনেক নারী আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন।
তবে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সুযোগই যথেষ্ট নয়; রাজনৈতিক অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে নারীদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন এখনো সীমিত। অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি এবং নারী ভোটারও অনেক বেশি। সেই বিবেচনায় রাষ্ট্র ও সরকারের উচিত নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং তাদের উদ্বুদ্ধ করা।
অবশ্য আমাদের সমাজের বাস্তবতায় এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর একটি বড় কারণ সামাজিক মানসিকতা। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের মানসিকতা এখনো পরিবর্তিত হয়নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে বাবাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা বদলালেও, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক বাবাই তাদের কন্যাসন্তানদের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে দিতে চান না। তারা মনে করেন, কিছু কাজ শুধুই পুরুষের জন্য। এই ধারণা ভুল এবং সময়োপযোগী নয়।
তাই নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের বাবাদের এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বা অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সব নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সমতা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আইনে নারী, শিশু ও কন্যাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বিধান রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তার প্রয়োগও দেখা যায়। তবে তা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে জরুরি হলো আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন; শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এই তিন ক্ষেত্রেই নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের দাবি।
নারীর অধিকার শুধু একটি সামাজিক ইস্যু নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও মানবিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নেই নির্ভর করছে একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার ভবিষ্যৎ।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেত্রী
অনুলিখন-নাহিদা স্মৃতি