রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন কতটুকু

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩৫ এএম

পুরনো ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে আজ সংসদ থেকে শুরু করে তৃণমূলের ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত নারীর সরব উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। আর এটাই প্রমাণ করছে যে, দেশ ও সমাজ পরিচালনায় তারা সমান দক্ষ। তবে বাংলাদেশেও নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও সামাজিক রূপান্তরের ফল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। একাত্তরের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নানান লড়াই সংগ্রামে সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবেই নারীদের অবস্থান। কিন্তু তবুও রাজনীতিতে ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের পেছনে রাখা হয়েছে। এর চিত্র দেখা যায় স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংসদে নারীদের অবস্থান পর্যালোচনা করলে।

আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদে (১৯৭৩) নারী সদস্য ছিলেন ১৫ জন। পরে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদে ৩২ জন, ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদে ৩৩ জন, ১৯৮৮ সালে চতুর্থ সংসদে ৪ জন, ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে ৩৫ জন, ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদে ৩৩ জন, ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদে ৩৮ জন, ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে ৫২ জন, ২০০৮ সালে নবম সংসদে ৭১ জন, ২০১৪ সালে দশম সংসদে ৬৯ জন, ২০১৮ সালে একাদশ সংসদে ৭২ জন এবং ২০২৪ সালে দ্বাদশ সংসদে ৬৯ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। আর এবারের নির্বাচনে মাত্র ৭ জন নির্বাচিত হয়েছেন।

গত ২৫ বছরে এটি সবনিম্ন। তবে কোনো সময়ই আশানুরূপভাবে সংসদে নারী সদস্য ছিলেন না, যেখানে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। যদিও বাংলাদেশের রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আসীন ছিলেন, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়, রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন কতটুকু?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানার মতে, কোনো দল বা জনগোষ্ঠী যদি মনে করে তারা আসলে নারীর ক্ষমতায়ন চায় না, তবে তারা মুখে যতই কথা বলুক, বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করবে না। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি যখন ঐকমত্য কমিশনে এগুলো নিয়ে কথা হয়েছে, তখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল জামায়াত। সে সময় তারা বলেছিল, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ তারা চায়। কিন্তু পরে তাদের নারীদের দিয়েই বলাচ্ছেন নারীর নেতৃত্বে একটি দেশ চলতে পারে না। জামায়াতে ইসলামী বা এই ধরনের সংগঠনগুলোর বক্তব্যে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে নারীর নেতৃত্ব তারা চায় না।

এবারের নির্বাচনে নারীদের বর্তমান অবস্থার কথা উল্লেখ করে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, বিএনপিও এই বছর নির্বাচনে খুবই অল্প সংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এতেই বোঝা যায় যে, নারীর ক্ষমতায়ন করতে হবে এটা একটা ‘রেটোরিক’ (কৌশল) হিসেবে তারা ব্যবহার করছে। বিভিন্ন সময় জনপ্রিয়তা অর্জন করা বা নারীর সমর্থন পাওয়ার জন্য এই কথাগুলো বলছে। তারা কিন্তু এখন পর্যন্ত এটা নিয়ে কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা করেনি।

অন্যদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে মুখে অনেক কথা বললেও কাজের ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বের হতে পারছে না। জুলাই বিপ্লবের পর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, যেখানে বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের বাস্তব চিত্র এখনো খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বড় দলগুলো নির্বাচনে বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের খুব কম সুযোগ দিচ্ছে। এমনকি যারা নিজেদের খুব প্রগতিশীল দাবি করেন, তারাও মন্ত্রিসভা বা দলীয় উচ্চপদে নারীর সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক নন।

ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী বলেন, যখন রাজপথে লড়াইয়ের দরকার হয়, তখন নারীর শক্তিকে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা ক্ষমতার অংশীদারত্বের প্রশ্ন আসে, তখন বলা হয় ‘নারীরা রাজনীতি বোঝে না’। জুলাই আন্দোলনে ছাত্রীরা যেভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা প্রমাণ করে নারীরা সাহস বা বুদ্ধিতে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। অথচ এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা রাজনৈতিক আলোচনায় নারীকে হেয় করার, এমনকি ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার মতো জঘন্য মানসিকতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে ৩৫০টি আসন। এর মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন, যা মোট আসনের প্রায় ১৪ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা আরও বলেন, সংরক্ষিত আসনে নারীর আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে না। কারণ দলগুলো তাদের অনুগতদের বা যাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাদেরই সেখানে মনোনয়ন দেয়। তিনি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীর অংশগ্রহণের দাবি জানান।

ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীও একমত পোষণ করে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে যারা থাকেন তারা তো আসলে একটা অর্নামেন্টাল ভাবে সেখানে অবস্থান করেন। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগ্রহের ভিত্তিই আসলে তাদের অবস্থানটা থাকে। এবং তাদের যে কার্যকরণ, সেটাও আসলে খুবই অর্নামেন্টাল হয়। এ জন্য আমরা দাবি করেছিলাম, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে হোক। কিন্তু অন্যান্য দলগুলোর দ্বিমতের কারণে সেটা হয়নি। এবং সেটা না হওয়ার কারণে আসলে নারীদের সংরক্ষিত আসনটা এক ধরনের আলংকারিক পর্যায়ে থেকে গেল বলে আমরা মনে করি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত