তথ্য গোপন করে তদন্ত প্রতিবেদন

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩৭ এএম

দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাস জীবন শেষ করে মাতৃভূমিতে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে (বিজি-২০২, বোয়িং ৭৮৭-৯) তিনি লন্ডন থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় অবতরণ করেন। এই ফ্লাইটের উড়োজাহাজটি লন্ডনে উড্ডয়নের প্রস্তুতির আগ মুহূর্তে জটিল যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। বিমানের প্রকৌশলীরা নিশ্চিত হয়েছেন, ইঞ্জিন চালু হওয়ার পরপরই বাম পাশের জেনারেটর বিকল হয়ে পড়ে। নানা চেষ্টা করেও তা চালু করা যায়নি। পরে মেরামত শেষে উড়োজাহাজটি উড্ডয়ন করে।

এ ঘটনায় বিমান কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদনে তারেক রহমানের নাম বা ফ্লাইটের উদ্দেশ্য উল্লেখ না করে শুধু ‘ভিভিআইপি ফ্লাইট’ বলা হয়েছে। বিমানের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবেদনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে।

বিমান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ‘দেশ রূপান্তর’কে জানিয়েছে, তদন্ত কমিটি দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ১৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে গুরুতর পদ্ধতিগত ত্রুটি, দায়িত্বে অবহেলা এবং প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই প্রকৌশলীর দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ উঠলেও উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা চেপে যাওয়া হয়েছে। এমনকি অভিযুক্তদের রক্ষা করতে একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর হয়েছে বলে অভিযোগ।

বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ‘দেশ রূপান্তর’কে বলেন, ‘ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় ফ্লাইটটি তারেক রহমানকে বহন করতে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। উড়োজাহাজটি আকাশে থাকা অবস্থায় বিস্ফোরণ বা অন্যান্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। আল্লাহর রহমতে আগেই ত্রুটি ধরা পড়ায় বিপদ এড়ানো গেছে। এ ঘটনার পেছনে শুধু প্রকৌশলীদের দায়িত্ব অবহেলা নয়, বিমানের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যর্থতা রয়েছে কিন্তু তাদের নাম প্রতিবেদনে আসেনি। বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৯ ও ১৭ ডিসেম্বর উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণে একাধিক অনিয়ম হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ১০ ডিসেম্বরের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় শেষ করা হয়েছেযা বোয়িং ৭৮৭-৯ বিমানের জন্য অস্বাভাবিকভাবে কম সময়। ত্রুটি নির্ণয়, কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং জনবলের বিস্তারিত লগ ও রেকর্ড উপস্থাপন করতে না পারা গুরুতর প্রশাসনিক ও কারিগরি অনিয়ম।’

প্রতিবেদনে তারেক রহমানের ফ্লাইটের কথা উল্লেখ না করে শুধু ‘ভিভিআইপি ফ্লাইট’ বলা হয়েছে। অভিযুক্তদের নাম বাদ দিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে এবং এ চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

তদন্তে দেখা গেছে, ১৫ দিনের ব্যবধানে একই যান্ত্রিক ত্রুটি তিনবার দেখা দিলেও তা ‘পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। বিমানের সিস্টেমে শেষ ২৭টি ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষণের কথা থাকলেও তদন্তকালে পর্যাপ্ত ডেটা পাওয়া যায়নি যা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গায়েব বা সংরক্ষণে অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।

গত ২১ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে সিলেটগামী বিজি-২০২ ফ্লাইটে আকাশে থাকা অবস্থায় আবার ভিএফএসজি (ভেরিয়েবল ফ্রিকোয়েন্সি স্টার্টার জেনারেটর) বিকল হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, ধারাবাহিক ত্রুটির পর প্রকৌশল বিভাগ তিন দফায় তিনটি ভিএফএসজি প্রতিস্থাপন করে যাতে ২৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, সমস্যার মূল কারণ জেনারেটর নয়; বরং জ্বালানি তেলের কুলার (ফুয়েল কুলার) ত্রুটিযুক্ত হওয়ায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। মূল কারণ নির্ণয় না করেই বারবার জেনারেটর বদলানো হয়েছে।

তদন্ত কমিটির মতে, এ ধরনের ত্রুটির কারণে উড্ডয়নকালে অগ্নিকাণ্ড বা গিয়ারবক্সের অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। প্রকৌশল বিভাগের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বিমানকে ভিভিআইপি ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়েছে যা দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের ডিসেম্বরে উড়োজাহাজের বাম ইঞ্জিনের জেনারেটর যন্ত্র পরপর তিনবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রতিস্থাপন করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এত অল্প সময়ে একই যন্ত্রে একাধিক ত্রুটি দেখা দিলে ‘পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি’ ঘোষণা করে বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তর তা করেনি। পুরো ঘটনায় প্রায় ২৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর উড়োজাহাজটি উড্ডয়নের সময় একই ত্রুটি ধরা পড়ে। অবতরণের পর জেনারেটর বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। ১৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার নতুন জেনারেটর বসানো হয়। কিন্তু প্রতিস্থাপনের পর ‘লো অয়েল প্রেসার’ সতর্কবার্তা দেখা দিলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিমানকে যাত্রী পরিবহনের ছাড়পত্র দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

২১ ডিসেম্বর আরেক ফ্লাইটে একই সমস্যা দেখা দেয়। পরে বিস্তারিত পরীক্ষায় জ্বালানি ও তেল তাপবিনিময় যন্ত্রে ত্রুটি শনাক্ত হয়। সেটি প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি জেনারেটর তৃতীয়বার বদলানো হয়। এত অল্প সময়ে একই যন্ত্র তিনবার প্রতিস্থাপন গভীর অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত দেয় কিন্তু মূল কারণ অনুসন্ধানে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জেনারেটর ভালো থাকা সত্ত্বেও এর পেছনে ২৩ কোটি টাকার মতো গচ্চা দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়, ত্রুটি নথিভুক্তকরণে বিলম্ব হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও নির্ভরযোগ্যতা পর্যবেক্ষণ দলের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় সীমিত ফ্লাইটের তথ্য সংরক্ষিত থাকায় পূর্ণাঙ্গ ত্রুটির ইতিহাস বিশ্লেষণ সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে বিমানের দুই প্রকৌশলী হীরালাল চক্রবর্তী ও মো. সাইফুজ্জামান খানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশোধন ও পরিষেবায় ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা যথেষ্ট সতর্কতা ও যাচাই-বাছাই করেননি। বিশেষ করে কম তেলচাপের সতর্কবার্তার পরও বিমানকে ফ্লাইটের ছাড়পত্র দেওয়াকে গুরুতর সিদ্ধান্তগত ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ ধরনের ঘটনা এড়াতে তদন্ত কমিটি বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হলো পুনরাবৃত্তিমূলক ত্রুটি শনাক্তে তাৎক্ষণিক সতর্কাবস্থা চালু করা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়া জোরদার করা, প্রতিস্থাপিত যন্ত্রাংশের বিস্তারিত পরীক্ষার প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা, আধুনিক সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ তথ্যব্যবস্থা চালু করা এবং মানবিক ফ্যাক্টর পর্যবেক্ষণ কাঠামো শক্তিশালী করা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত